নতুন সূর্য

লেখক: ইমন শেখ
প্রকাশিত হয়েছে : মার্চ ৩১, ২০২৬ | দেখা হয়েছে: ১০৮ বার

শীত শেষ। কিন্তু ঠাণ্ডার ভাবটা এখনো যায়নি। বিশেষ করে শেষ রাতে ঠাণ্ডাটা এমন ভাবে হামলে পড়ে যে কাঁথার বর্ম ছাড়া সে আক্রমণ প্রতিহত করা যায় না। শীমলা তাই কাঁথাটা জড়িয়ে নিল গায়ে। ছেড়া হলেও ওতে দারুণ ওম। ফলে একটা গাঢ় আদুরে ঘুমের আবেশ বিভোর করে তাকে। তারপর সেই ঘুমে বিভোর চোখ সবার অলক্ষ্যে পৌঁছে যায় স্বপ্নলোকে।  মুহুর্তেই পাল্টে যায় পরিবেশ। একদিকে ঝরনা ধারা অন্যদিকে ফুলের মেলা। ফুলে ফুলে রঙিন প্রজাপতি। আহ! সে কী মনোরম দৃশ্য! তবে এই মুহুর্তে শিমলার সমস্ত মনোযোগ কেড়ে নিয়েছে শাকিব খান। সিনেমার দৃশ্যের মতোই স্বপ্নে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের তালে তালে একগুচ্ছ টকটকে লাল গোলাপ হাতে হেলেদুলে তার দিকেই এগিয়ে আসছে শাকিব খান। তারপর সেই মাহেন্দ্রক্ষণ - মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে তার গোলাপ ভর্তি হাতটি বাড়িয়ে প্রেম নিবেদন করতেই শিমলার ব্রন ওঠা ঘুমন্ত মুখে ফুটে উঠে ঈষৎ হাসির আভা।

স্বপ্ন রাজ্যে শিমলা যখন শাকিব খানের সাথে প্রেমে মশগুল ঠিক তখনই তার পাশে হাঁটুতে মাথা গুজে বসে আছে ছবিরন। বয়স তার সত্তর পেরিয়ে তিন কি চার। রাত শেষ হতে চললো অথচ তার ঘোলাটে চোখ এখনো ঘুমহীন। একটা অজানা শঙ্কা শেকড় গেঁড়েছে তার মনে। কেন যেন তার মনে হয় অচিরেই ঘটতে চলেছে এক অঘটন। আলামত কি স্পষ্ট নয়? মনে মনে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে চলে তার বৃদ্ধ মস্তিষ্ক। চোখ বন্ধ করে রাতের অদৃশ্য দেয়ালে কান পেতে হাওয়ায় ঝোক বুঝতে চায় ছবিরন। রাতের নিস্তব্ধতা বিদীর্ণ করে ভেসে আসা কুকুরের বিরামহীন ঘেউঘেউ কিংবা কদম গাছের ডালে একটানা ডেকে চলা কুক পাখির ডাক যে কত বড় কুলক্ষণ সত্তরোর্ধ্ব পোড়খাওয়া ছবিরন কি আর তা বোঝে না! নিঃশ্বাসের সাথে আসন্ন বিপদের গন্ধ ঢোকে তার বোঁচা নাকে। সুতরাং নির্বিকারভাবে আর বসে থাকা যায় না। ব্যাথা জর্জরিত মাজা নিয়ে অতি কষ্টে উঠে দাঁড়ায় ছবিরন। চালের বাতা হাতড়ে টেনে বের করে আনে বহু বছর ধরে সযত্নে গুছিয়ে রাখা একখানা রামদা। ঠাণ্ডা এই ধাতব বস্তুখানার একটা ইতিহাস আছে। বস্তুটি হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখতে গিয়ে যেন সেই ইতিহাসের বন্ধ দরজার কড়া নড়ে ওঠে। অনিশ্চিত সেই রাত মুহুর্তেই মিশে যায় পঞ্চান্ন বছর আগের আরেকটি অনিশ্চিত রাতের সাথে। সারাদেশ তখন ছেয়ে গেছে মিলিটারিতে। গ্রামে গ্রামে জ্বলছে আগুন। রাতবিরেতে গুলির শব্দ। নদীতে ভেসে আসছে লাশ। গ্রামের ব্যাটা ছেলেরা রাতের আঁধারে পালিয়ে যাচ্ছে ভারতে। যুদ্ধের ট্রেনিং নিয়ে ফিরবে তারা। ছবিরনের স্বামী সুঠাম দেহী রশিদ। সেও একদিন পাড়ি জমায় ভারতে। সদ্য বিবাহিত ছবিরনের গায়ে তখনও কাঁচা হলুদের গন্ধ। উঠতি বয়সের বাড়ন্ত যৌবন নিয়ে ছবিরন তখন মহাসংকটে। পাড়ায় পাড়ায় পিস কমিটির শয়তানগুলো বেপরোয়া। বউঝিদের ইজ্জত-আব্রু রক্ষা করা দায়। এরকমই চরম অনিশ্চিত এক রাতে পিস কমিটির আলতু ঢুকে পড়ে তার ঘরে। আল্লাহ রাসূলের দোহাই দিয়ে কেঁদেকেটে অনুনয়-বিনয় করেও রেহাই পাবার কোন লক্ষণ না দেখে বিছানা হাতড়ে সিথানে লুকিয়ে রাখা রামদাটি  টেনে বের করে আনে সে। তারপর গায়ের সর্বশক্তি দিয়ে এক কোপে খসিয়ে দেয় আলতুর একটি হাত। তবে সেটি ডান হাত ছিল নাকি বাম হাত তা মনে করতে তার সত্তরোর্ধ্ব বুড়ো মস্তিষ্ককে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়। ডান বামের দোলাচল কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই পায়ের আওয়াজ পেয়ে সচকিত হয়ে ওঠে ছবিরন। অতি সন্তপর্ণে মাঁচার আড়ালে লুকিয়ে পজিশন নেয় সে। কোটরাগত চোখ দুটি নিবদ্ধ করে ভাঙা দরজার ওপর। এদিকে পায়ের আওয়াজ ক্রমাগত নিকটবর্তী হতে হতে একসময় থেমে যায়। অনায়াসে ভাঙা দরজা ঠেলে নিমেষেই ঘরে ঢুকে পড়ে কেউ একজন। হারিকেনের মৃদু আলোতে তাকে ঠিকই চিনে ফেলে ছবিরন। আলতুর ছেলে জলিল। আফসোসের অন্ত থাকে না তার। ঈশশ...! 

সেদিন যদি আলতুর মুন্ডুটা নামিয়ে দিতে পারতো সে! পারেনি বলেই ঝাড়ে বংশে আবারও মাথা চারা দিয়ে উঠেছে ওরা।  নিশপিশ করতে থাকে তার হাত। না, এবার কিছুতেই ভুল করা চলবে না। মনে মনে নিজেকে বারবার সতর্ক করে নেয় ক্ষোভে ফুসতে থাকা ছবিরন। ওদিকে পিস্তল ঘুরাতে ঘুরাতে জলিল অতি সন্তপর্ণে এগিয়ে যায় ঘুমন্ত শিমলার দিকে। তার শক্ত পুরুষালী উন্মত্ত কামুক হাতের ছোঁয়ায় জেগে ওঠে শিমলা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই জলিল পিস্তলের নল গুঁজে দেয় তার মুখে। ছবিরনের বুড়িয়ে যাওয়া শরীরে তখন ফিরে আসে পঞ্চান্ন বছর আগের সেই জোশ৷ হিম হয়ে যাওয়া বুড়ো রক্তে ওঠে তেজোদৃপ্ত জোয়ার। এখনই উত্তম সময়। তাই কালক্ষেপন না করে আস্তে আস্তে মাঁচার আড়াল হতে বেরিয়ে আসে সে। কিন্তু শিমলাকে কাবু করার ব্যস্ততায় বুড়ি ছবিরনের অস্তিত্ব টের পায়না কামাতুর জলিল। পেছন থেকে এসে দুর্বল শরীরের সর্ব শক্তি দিয়ে ছবিরন কোপ বসিয়ে দেয় জলিলের ঘাড়ে। সজোরে পরপর তিনটি কোপ। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছোটে চারদিকে। কাটা ছাগলের মতো দাপাতে দাপাতে মেঝেতে নিস্তেজ হয় জলিলের মুন্ডুহীন ধড়। ঘটনার আকষ্মিকতায় প্রচন্ড ভয় পেয়ে যায় শিমলা। কম্পন ধরে তার সারা শরীরে। ডুকরে কেঁদে ওঠে সে। রক্তস্নাত হাতে পরম মমতায় নাতনিকে বুকে টেনে নেয় ছবিরন। ততক্ষণে পরিষ্কার হতে শুরু করেছে চারপাশ। রাতের আঁধার ঘুচিয়ে পুব আকাশে উঠেছে নতুন সূর্য। আর ভয় নেই। দুটি হৃদপিণ্ডের হৃৎস্পন্দনে তখন সম্মিলিত স্বস্তির ঝংকার।

        xxxxx

ইমন শেখ

নড়াইল,বাংলাদেশ।

শেয়ার করুন:
মন্তব্যসমূহ (0)

এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। যেসব ঘর পূরণ করা বাধ্যতামূলক, সেগুলোতে * চিহ্ন দেওয়া আছে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন