কিন্নর রহস্য

লেখক: গৌতম সরকার
প্রকাশিত হয়েছে : মার্চ ১১, ২০২৬ | দেখা হয়েছে: ১৫৭ বার

সারা দেশ জুড়ে বিভিন্ন শহর থেকে একের পর এক নিরুদ্দেশ হয়ে যাচ্ছে ৮ থেকে ১৪ বছরের ছেলেমেয়ে। এবার শহর ছেড়ে নিরুদ্দেশের খবর গ্রামের দিক থেকেও আসতে শুরু করেছে৷ রেডিও, টিভি, সোশ্যাল মিডিয়ায় তুমুল তর্ক-বিতর্ক, চাপান-উতোর চলছে। সমস্যার সমাধানের জায়গায় অন্তর্ধানের সংখ্যা দিনদিন বেড়ে চলেছে। মানুষের ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙেছে। তারা মিটিং, মিছিল করছে, প্রতিবাদ সভা করছে, পথ অবরোধ থেকে শুরু করে থানা অবরোধ  করে অপদার্থ পুলিশ ও প্রশাসনের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করছে। সন্দেহ  করা হচ্ছে বাচ্চাগুলোকে মধ্য-প্রাচ্যের দেশগুলোতে চালান করে দেওয়া হচ্ছে।

কলকাতার একটা নামকরা কলেজের জীববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী এবং ছাত্রছাত্রীদের কুড়িজনের দল আজ সকালে সিমলা পৌঁছেছে। থাকার হোটেলটা মল থেকে অনেকটা নিচে। মল পৌঁছতে লিফট চড়তে হয়। বিকেলে মলে ঘুরে বেড়াচ্ছিল ফিফথ সেমিস্টারের রাজবীর, পৃথ্বী, শাহীন, তীর্থ আর সুনন্দিনী। বাকিরা কেউ কালীবাড়ির দিকে গেছে আর মেয়েগুলো ছুটেছে লক্করবাজার। আসলে সিমলায় আজকের রাতটাই থাকা হবে, ফেরার সময় অন্যপথে চন্ডিগড় পৌঁছে ট্রেন ধরা হবে। যাকিছু কেনাকাটা আজই সেরে নিতে হবে। সুনন্দিনীকেও ডেকেছিল কিন্তু ও সন্ধ্যের সিমলা মলের মন্তাজ ছেড়ে যেতে রাজি হয়নি। খুব ছোটবেলায় বাবা-মার সাথে একবার এসেছিল, এখন ঘুরে ঘুরে সেইসব স্মৃতি হাতড়ে বেড়াচ্ছে, আর বেশিরভাগটাই মেলাতে না পেরে হাহুতাশ করে নিজের ও বাকিদের মাথাখারাপ করে তুলছে। থাকতে না পেরে পৃথ্বী বলে উঠল, 'তু থোড়া চুপ যা ইয়ার! চেঞ্জ ইজ আ ফান্ডামেন্টাল ফ্যাক্ট'৷ পৃথ্বীকে পাত্তা না দিয়ে সুনন্দিনী চেঁচিয়ে ওঠে, 'এ বাবা! এখানে একটা আইসক্রিম পার্লার ছিল, এই বসার জায়গাটার গা ঘেঁসে। ডিসেম্বরের শীতে মলে বসে হি হি করে কাঁপতে কাঁপতে আইসক্রিম খাওয়ার কি যে মজা!' ছেলেরা কিছু না বলে উল্টোমুখে হাঁটা লাগাল। এবার পিছন থেকে সুনন্দিনী দৌড়ে এসে রাজবীরের হাত জড়িয়ে ধরে আদুরে গলায় বলে উঠল, 'অ্যাই রাজ, আমাকে আইসক্রিম খাওয়া!' রাজবীর হাত ছাড়িয়ে বলে উঠল, 'আরে ইয়ার! কাঁহা হ্যায় আইসক্রিম? তুমহি তো বোলা পার্লার বন্ধ হো গিয়া!"
"অ্যাই বুদ্ধু সিমলায় কি একটাই আইসক্রিম পার্লার ছিল? নাকি এত বছরে আর একটাও গজায়নি?"
রাজ বলল, “ঠিক আছে তুই একটা দোকান খুঁজে বের কর, তীর্থ আজ সবাইকে আইসক্রিম খাওয়াবে।" দলের মধ্যে থেকে একজন ছিটকে বেরিয়ে বলে উঠল, “ওরে বাবা! মাপ করো ইয়ার! আমার কিপটে বাবার কাছ থেকে বহু কষ্ট কয়েকটা টাকা ম্যানেজ করে এখানে এসেছি। আইসক্রিম কেন একটা টফি খাওয়ানোরও সংগতি আমার নেই”৷ সুনন্দিনী এবার সবাইয়ের দিকে এমন কটকটে চোখে তাকালো যেন পারলে এক্ষুনি ভষ্ম করে দেয়। ছেলেরা অন্যদিকে মুখ ফেরালো৷

লক্করবাজারে একটা দোকান থেকে কেনাকাটা সেরে বেরোতেই প্রচণ্ড গতিতে চলা  একটা বাস প্রায় ধাক্কা মেরে দিচ্ছিল শ্রেয়াঙ্কাদের। এক্ষুনি একটা বিপদ ঘটতে চলেছিল। পাগল ছাড়া এরকম ব্যস্ত রাস্তায় কেউ এই স্পিডে গাড়ি চালায়! কিন্তু কে কি বলবে! পিছনে কয়েকজন ট্রাফিক পুলিশ বুথে বসে গল্প করছে৷ হুসনুল বলল, “গাড়িটা একপলক আমার চোখে পড়েছে, মনে হল যেন যে মহিলা সিমলা থেকে শিবালিক এক্সপ্রেসে আমাদের বগিতে এলেন তাকে দেখলাম, আরে ওই যে! পাশে একটা লোকও ছিল! সারাটা পথ দুজনে ঘুমিয়ে এল।" জাহ্নবী বলল, 'হ্যাঁ হ্যাঁ মনে পড়েছে, আমাদের অত চেঁচামেচির মধ্যেও নাক ডেকে ঘুমিয়ে যাচ্ছিল, বাবা কি ঘুম!' হুসনুল বলল, ‘হ্যাঁ আমরা বলাবলি করছিলাম না.... চারপাশের এত চমৎকার দৃশ্য ছেড়ে মানুষ ঘুমায় কি করে! মনে হচ্ছে গাড়িটার সামনের সিটে লোকটাও ছিল’। পিয়াশা বলল, 'আমারও যেন মনে হচ্ছিল ওরা ট্যুরিস্ট নয়!'

আইসক্রিম খেয়ে পাঁচজনে মলের নিচের রাস্তা ধরে লিফটের দিকে ফিরছিল। সাতটার মধ্যে ফিরতে হবে, ডি.এ স্যার সাড়ে সাতটায় ক্লাসে ডেকেছেন। সন্ধ্যেবেলা সিমলার রাস্তায় ভিড় উপচে পড়েছে, তার মধ্যেই ওরা চেষ্টা করছিল একটু পা চালিয়ে হাঁটতে, দেরি হলে প্রথমদিনই স্যারের বকুনি খেতে হবে। ঠিক সেই সময় একটা লোক উল্টোদিক থেকে এসে তাদের দলটাকে ধাক্কা দিয়ে দৌড়ে চলে গেল। পৃথ্বীর হাতের আধখানা আইসক্রিম আর সুনন্দিনীর পার্স রাস্তায় পড়ে গেল। রাজবীর ঘুরে কিছু বলার আগেই দেখল লোকটা ‘এক্সকিউজ মি’ ‘এক্সকিউজ মি’ বলতে বলতে একে ওকে ঠেলে এগিয়ে গেল। মনে হল কারুর একটা পিছু নিয়েছে। লিফটে ঢোকার ঠিক আগে শাহিন বলে উঠল, "এই শোন! ওই লোকটাকে কাল শিবালিক এক্সপ্রেসে দেখেছি, আমাদের কুপেই ছিল, পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছিল, সঙ্গে একজন মহিলা ছিল।" শাহিনের কথা কারোর কানে গেল কিনা কে জানে! লিফটের দরজা খোলা পেতে দৌড়ে সবাই উঠে পড়ল।

সিমলা থেকে সারহান যাওয়ার দেড়শো কিলোমিটারের রাস্তাটা ছবির মত সুন্দর৷ দলের প্রবীণ অধ্যাপক দেবোপম আচারিয়ার কাছে সদ্য কলেজে জয়েন করা দেবলীনা ম্যাডামের একটা আবদার ছিল যাওয়ার পথে কুফরী ঘুরে যেতে হবে। সেটা শুনেই ছাত্রছাত্রীরা হইহই করে ম্যাডামকে সমর্থন জানাল। ওখানে একটা জিওলজিক্যাল পার্ক দেখতে আর ঘোড়ার পিঠে চড়ে কুফরী টপ ঘুরে আসতে অনেকটা সময় গেল। ফলে সারহানের হোটেল প্রিন্সে ঢুকতে সন্ধ্যে পেরিয়ে গেল। ছেলেমেয়েদের একটু তৈরি হওয়ার সময় দিয়ে দেবোপম স্যার রাত নটার সময় ক্লাস ডাকলেন।

সারহানে দ্বিতীয় সকাল শুরু হল এখানকার বিখ্যাত ভীমাকালী মন্দির দর্শন দিয়ে। এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বুশাহার বংশের রাজারা। এটি ৫১ শক্তিপীঠের অন্যতম। আজকে হোটেল থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে জঙ্গল ঘেরা পাহাড়ি জায়গায় কাজ হবে। ষোলজন ছাত্রছাত্রীকে চারটে গ্রুপে ভাগ করে দেওয়া হল। একটা দল একশো বর্গফুট ঘেরা জায়গায় বিভিন্ন প্রাণী স্টাডি করবে, বিশেষ করে পতঙ্গ, পিঁপড়ে, পোকামাকড় ইত্যাদি। পাহাড়ে যে কতরকমের পিঁপড়ের বাস তার ইয়ত্তা নেই। বাকি দলগুলো জঙ্গলের ভিতরে ঢুকবে পাখি, প্রজাপতি আর সরীসৃপের সন্ধানে। এক একটা দলের সঙ্গে থাকবে দেবলীনা ম্যাডাম, শিক্ষাকর্মী মিতালী আর শিবনাথ। ড্রাইভার ছেলেটির ইতিমধ্যে শিবনাথের সঙ্গে ভাব হয়ে গেছে, সেও গুটি গুটি পায়ে শিবনাথের পিছন পিছন রওয়ানা হল। দেবোপম প্রথম দলটার সঙ্গে রয়ে গেলেন।

ছোটবেলায় প্রজাপতির পিছনে দৌড়োনো সবচেয়ে প্রিয় খেলা ছিল অযুতার। তবে কখনোই ধরার চেষ্টা করত না। দেখাতেই ছিল তার আনন্দ! কতরকমের রং একটা শরীরে থাকতে পারে ভেবে আশ্বর্য হত। প্রাণীবিদ্যা নিয়ে পড়তে এসে সেই ভালবাসা আরও বেড়ে গেছে। অনেকক্ষণ থেকে একটা নীল সাদা প্রজাপতি, গায়ে হলুদ বুটি তার সাথে লুকোচুরি খেলছে। এদিকটায় জঙ্গল বেশ ঘন, পায়ের নিচে ছোট গুল্ম আর কাঁটাঝোপ। দেখে চলতে হচ্ছে, নাহলে হুমড়ি খেয়ে পড়ার সম্ভাবনা। একটা জেদ চেপে গেল অযুতার। কিছুক্ষণ একটা গাছের নিচে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তার কোনও সাড়াশব্দ না পেয়ে প্রজাপতিটাও একটা ঝোপের মধ্যে চুপচাপ বসে রইল। যেই নড়াচড়ার শব্দ পেল, পরক্ষণেই আবার গাছপালার মধ্যে দিয়ে উড়ে চলল। এরপর একটা ছোট নালা পেরোতে গিয়ে জুতোটা ভিজে গেল। ইতিমধ্যে দল ছাড়া হয়ে অনেকটা দূরে চলে এসেছে। মনে হল দুর থেকে কেউ তার নাম ধরে ডাকল। কিন্তু এখন উত্তর দেওয়া যাবেনা, তাহলে প্রজাপতিটা একেবারে চোখের বাইরে চলে যাবে। আস্তে আস্তে গুঁড়ি মেরে এগিয়ে চলল অযুতা, একটু সুযোগ পেলেই মোবাইল ক্যামেরায় একটা ছবি নিয়েই ফিরবে। কিছুটা এগোনোর পর সব আশা ধুলিসাৎ হয়ে গেল। হঠাৎ জঙ্গলের ভিতর থেকে দুদ্দাড় আওয়াজ আসতে লাগল। আওয়াজটা এই দিকেই আসছে। চট করে একটা গাছের আড়ালে চলে গেল, কিছুক্ষণ পর দুটো আট-নয় বছরের ছেলেমেয়ে জঙ্গল ভেঙে দৌড়ে এল, পিছনে পিছনে বিজাতীয় ভাষায় চিৎকার করতে করতে ছুটে এল একজন পুরুষ ও মহিলা, দুজনেই পাহাড়ি। মেয়েটি পায়ে লতা জড়িয়ে পড়ে যেতেই লোকটি ঝপিয়ে পড়ে চড়চাপড় মারতে লাগল, বাচ্চা ছেলেটি ছুটে এসে মেয়েটাকে তুলতে গিয়েছিল, মহিলাটি পিছন থেকে এসে তাকেও পাকড়ে ধরল। তারপর যেদিক থেকে এসেছিল সেদিকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে চলল। ঘটনার আকস্মিকতায় অযুতা থর থর করে কাঁপতে লাগল। চোখের সামনে কি ঘটল বুঝতে পারল না। যতদূর বুঝেছে, লোকটি আর মহিলা বাচ্চাগুলোর বাবা-মা নয়, আর বাচ্চাগুলোকে একদম পাহাড়ি বাচ্চাদের মত মনে হয়নি। জঙ্গল বড় রহস্যময়, অযুতার ভয় করতে লাগল। প্রজাপতির আশা ছেড়ে দ্রুত পায়ে ফিরে চলল।

পরের দিন সকাল থেকে শুরু হল আকাশভাঙা বৃষ্টি৷ স্নানটান সেরে তৈরি হয়ে ডাইনিংয়ে এসে দেবোপম দেখলেন ছেলেমেয়েরা সবাই এখনও আসেনি, তবে দেবলীনা আর শিবনাথ দুজনেই আছে। ওরা তার জন্যই অপেক্ষা করছিল। ফোন করে ভগীরথকে ডাকা হল। ভগীরথ এসে বলল, 'আরে স্যার চিন্তা করবেন না, এটা বর্ষার বৃষ্টি নয়। হঠাৎ শুরু হয়েছে, হঠাৎ করেই থেমে যাবে। খুব জোর ব্রেকফাস্টের পর নাহলে লাঞ্চের পর আমরা বেরিয়ে পড়ব'। ভগীরথের কথাই সত্যি হল। লাঞ্চ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলনা, তার আগেই বৃষ্টি থামলো। কিন্তু বেরোনোর ঠিক আগেই একটা ঘটনা ঘটল যে কারণে বেরোতে বেরোতে দুপুর একটা বেজে গেল। সবাইকে তৈরি হতে নির্দেশ দিয়ে নিজের ঘরে গিয়ে জিনিসপত্র গোছাচ্ছিলেন দেবোপম, শিবনাথও ঘরে ছিল। এমন সময় ফোনটা বেজে উঠল। শিবনাথ ধরল, কিছুক্ষণ ওপাশের কথা শুনে মাউথ পিসে হাতচাপা দিয়ে জানাল, ‘ম্যানেজার সাহেবের ফোন, স্থানীয় থানার ওসি এসেছে, দেবোপমের সঙ্গে দেখা করতে চায়’৷ দেবোপমের ভ্রু কুঁচকে গেল, থানা থেকে অফিসার এসেছে তার সাথে কথা বলতে! শিবনাথও হতবাক। তবে এখন এতকিছু ভাবার সময় নেই, দেবোপম দরজার দিকে এগিয়ে গেল। 
শিবনাথ বলল, “আপনি এগোন আমি ভগীরথকে নিয়ে আসছি।“ 

দেবোপম আচারিয়া, অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর অফ জুলজি, হেড অফ দ্য ডিপার্টমেন্ট, শান্ত স্বভাবের মানুষ, তিনি যে এতটা রেগে উঠতে পারেন সেটা ছাত্রছাত্রীরা তো দূরের কথা, কলেজের প্রবীণ কর্মচারী শিবনাথও কোনওদিন দেখেননি। বাড়ি থেকে আড়াই হাজার কিলোমিটার দূরে এতগুলো ছেলেমেয়েকে অচেনা একটা জায়গায় এনে পড়াশোনার পাশাপাশি সঠিক খাওয়াদাওয়া, শারীরিকভাবে সুস্থ রাখা, সর্বোপরি নিরাপত্তার দিকটা দেখতে প্রচুর শারীরিক এবং মানসিক চাপ নিতে হয়। তারপর যদি নিজেরাই সমস্যা তৈরি করে, কাউকে কিছু না জানিয়ে গোয়েন্দাগিরি শুরু করে, তাহলে তার পক্ষে সবকিছু সামলানো মুশকিল। কিছু একটা অঘটন ঘটে গেলে এই ট্যুরের কনভেনর হিসেবে তাকে জবাবদিহি করতে হবে। আজ পুলিশ অফিসারের কাছে সব ঘটনার কথা শুনেছেন। অযুতার ব্যাপারটি ছেলেমেয়েরা ডিনারের সময় জোরে জোরে আলোচনা করেছে, হোটেলের রাঁধুনি ছেলেটি বাঙালি, সে ম্যানেজারকে জানিয়েছে। এই মুহূর্তে সারা দেশে কি ঘটে চলেছে সেটা সবাই জানে। ম্যানেজার স্থানীয় থানাকে জানালে ডিউটি অফিসার তড়িঘড়ি এসে তাদের সঙ্গে দেখা করে আসল ঘটনাটা শুনতে চায়। সেই কারণে বৃষ্টি ছেড়ে গেলেও হোটেল ছেড়ে তারা বেরিয়েছে দুপুর একটায়।

ছোটবেলা থেকে দেবলীনা গঙ্গোপাধ্যায় গোয়েন্দা বইয়ের পোকা। পড়ার বইয়ের ভিতরে পাণ্ডব গোয়েন্দা, ব্যোমকেশ, ফেলুদা, ঋজুদা, স্বপনকুমার লুকিয়ে পড়তে গিয়ে কতবার যে মায়ের হাতে মার খেয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। বইই ছিল একমাত্র নেশা। বড় হয়ে গোয়েন্দাগুলোর একটু বদল ঘটল, প্রিয় হয়ে উঠল শার্লক হোমস, আগাথা ক্রিস্টির এরকিউল পোয়েরো, মার্পেল, ইনস্পেক্টর মর্স, ফাদার ব্রাউন, ফিলিপ মার্লো এইসব। সেই দেবলীনা দেবোপমবাবুর মত এই বিষয়টি পাশ কাটিয়ে যাবে সেটা হতে পারেনা। সাংলা পৌঁছে সেই রাতেই ডিনারের পর কয়েকজন ছাত্রছাত্রীকে নিজের ঘরে ডেকে পাঠালেন।

সাংলার সৌন্দর্য কয়েকশো গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে শহরের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলা বাসপা নদী। এই নদী জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীবৈচিত্র্যের আকর। ছাত্রছাত্রীদের কাজ হবে নদীর বিভিন্ন অংশে এগুলো স্টাডি করা। পরের দিন সকালে ভগীরথ সবাইকে সাইটসিয়িংয়ে নিয়ে গেল। 
 এই ঘুরতে গিয়ে যে ঘটনাটি ঘটল সেটার পর আর ব্যাপারটি থেকে দূরে থাকা গেলনা। 

সকালে বেরিয়ে প্রথমে যাওয়া হল আট কিলোমিটার দূরের আদিবাসী গ্রাম বাতসেরি। এখানকার হাতে বোনা শাল, কিন্নরী টুপি খুব বিখ্যাত৷ গ্রামে একটা ট্রাউট ফিসিং ফার্ম আছে। গ্রাম দেখে সবাই ট্রাউট ফিসিং ফার্ম ঘুরে ঘুরে দেখছিল। দেবোপম স্যার মাছের জীবনচক্র বোঝাচ্ছিলেন, ডিম থেকে পূর্ণাঙ্গ মাছে পরিণত হওয়ার পর্যায়গুলো চোখের সামনে সাজানো আছে, প্রাণীবিদ্যার ছাত্রছাত্রীদের কাছে এই সুযোগ যথেষ্ট আকর্ষণীয়। সবাই মন দিয়ে স্যারের কথা শুনছে এমন সময় হঠাৎ হাতে একটা রাম চিমটি খেয়ে 'আউচ' বলে চেঁচিয়ে উঠল দিব্যাংশ। দেবোপমবাবু কথা থামিয়ে একবার তাকালেন তারপর আবার নিজের কথায় মন দিলেন। সেদিনের ঘটনার পর স্যার বেশি গম্ভীর হয়ে গেছেন। অযুতা ফিসফিস করে দিব্যকে জানাল, 'সেদিনের জঙ্গলের লোকটা এক্ষুনি আমার পাশ দিয়ে পিছনের দিকে গেল।'
'তুই নিশ্চিত, সেদিনের লোকটা?'
'হান্ড্রেড পার্সেন্ট। আমি সেদিন গাছের আড়াল থেকে খুব ভালোভাবে দেখেছিলাম'। এটা শুনেই দিব্যাংশ অযুতার হাত ধরে টান দিল। ফার্ম থেকে বেরিয়ে ওরা চট করে পিছনের দিকে চলে এল৷ অযুতা বলল, 
'কাউকে না বলে চলে এলাম, ম্যাম কিন্তু শর্ত করে দিয়েছিলেন যা কিছু ঘটুক ওনাকে আগে বলতে'
'আরে বুদ্ধু! এখনও কিছু ঘটেনি, কিছু ঘটলে দেখা যাবে। তাছাড়া ম্যামতো ডিএ স্যারের পাশে ছিল, কি করে ডাকতিস!'
'তবু' অযুতা ইতঃস্তত করে
'আরে ইয়ার, ম্যামকে ম্যানেজ করে নেব’
এদিকটায় কেউ কোথাও নেই কোনদিকে এগোবে বুঝতে পারছে না। এমন সময় জঙ্গলের দিক থেকে একটা লোক বেরিয়ে এল, ওরা চট করে গাছের আড়ালে চলে গেল৷ দিব্যাংশ অযুতার দিকে তাকাতে ও মাথা নাড়ল, অর্থাৎ ইনিই সেই ব্যক্তি! লোকটা কোনও দিকে না তাকিয়ে ফার্মের ভিতরে ঢুকে গেল৷
দিব্যাংশ অযুতাকে বলল, 'চল একবার ওদিকটা দেখে আসি', লোকটা যেদিক থেকে এল সেদিকটা ইশারা করে দেখাল।
অযুতা ভয় পেয়ে বলল, 'দেরি হয়ে যাবে! আমাদের দেখতে না পেয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু যাবে'
'আরে দেরি হবে না, স্যার তো এরপর ডিসেকশনে ব্যস্ত থাকবে, কথা বলে সময় নষ্ট হচ্ছে...জলদি চল'। ওরা দ্রুতপায়ে পাইন বনের জঙ্গলে ঢুকে গেল। সামনে একটা সরু পায়ে চলা পথ, সারা রাস্তায় পাইনের শুকনো ফল পড়ে আছে।

কিছুটা এগোনোর পর নদীর আওয়াজ কানে এল, বাসপা এদিকে অনেকটা বাঁক নিয়ে পাইনবন ছুঁয়ে গেছে, মিনিট দুয়েক হাঁটার পর জঙ্গল একটু পাতলা হতে নদীর দেখা মিলল, তবে নদীর কাছে যাওয়া যায়না, এখানে বাসপা অনেক নিচ দিয়ে বয়ে গেছে। কোথাও জনমানবের চিহ্ন নেই৷
অযুতা বলল, 'চল দিব্য ফিরে যাই' দিব্যও তাই ভাবছিল- দুজনে ফেরার জন্য ঘুরতেই কুকুরের ডাক কানে এল, ওরা দাঁড়িয়ে গেল। যেদিক থেকে ডাক আসছে সেদিকে কিছু চোখে পড়লোনা, চলে যাবে কিনা ভাবছে এমন সময় জঙ্গল ভেঙে দুটো কুকুর দৌড়ে এসে ওদের গায়ের উপর দিয়ে অন্যদিকে ছুটল৷ ওদের কৌতূহল বেড়ে গেল, কুকুরগুলো যেদিক থেকে এল সেদিকে এগিয়ে গেল, কিছুদূর যাওয়ার পর দুটো কাঠের কটেজ চোখে পড়ল, একদম নদীর ওপর। এই জঙ্গলাকীর্ণ জায়গায় কটেজ দেখে একটু অবাকই হল। এখানে না আছে গাড়ির রাস্তা, না পায়ে চলার। অন্য কোনও রাস্তাও তো চোখে পড়ছে না। সামনের ফাঁকা অংশটায় যেতে সাহস হল না। গাছের আড়ালে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। মিনিট দুয়েক এভাবে কেটে গেল।

কটেজ থেকে কোনও আওয়াজ আসছে না, কটেজটা নিয়ে কৌতুহল বেড়ে চলল৷ তবে যা করতে হবে চটপট করতে হবে, আর দেরি করা যাবেনা। ইতিমধ্যে ওদিকে বোধহয় খোঁজখবর শুরু হয়ে গেছে। দুজনে চুপি চুপি কটেজের পিছন দিকে এল। সামনের দিকে যাওয়াটা রিস্ক হয়ে যাবে, কারও চোখে পড়ে যেতে পারে। অনেক উঁচুতে একটা জানালা আছে, নাগাল পাওয়া সম্ভব নয়। কাঠের দেওয়ালে কান পাতল, যদি ভিতর থেকে কোনও আওয়াজ আসে। কোনও আওয়াজ নেই, কেবল নদীর স্রোত আর পাইনবনে হাওয়া কাটার শব্দ। চলে আসতে যাচ্ছে এমন সময় একটা তীব্র জান্তব শব্দে দুজনে চমকে উঠল। কিন্তু একটা বিপদ ঘটে গেল, অযুতা ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠেছে। কটেজের সামনের দিক থেকে একটা পুরুষের গলা পাওয়া গেল, 'কওন ?' ওরা পাইনবনের দিকে দৌড়ল। কিন্তু শেষরক্ষা হলনা। তার আগেই তারা চোখে পড়ে গেছে, আগের লোকটাই চিৎকার করে উঠল, 'শুকদেব, কোই ভাগ রহা হ্যায়, পাকড়ো...'৷ এই নির্দেশ দিয়ে নিজেও ওদের পিছু নিল। দিব্যাংশ কলেজের ১০০ মিটার স্প্রিন্ট চ্যাম্পিয়ন, কিন্তু অযুতাকে নিয়ে এই ঘন জঙ্গলের অমসৃণ পথে দৌড়ানো মুশকিল হয়ে দাঁড়াল। তার ওপর অচেনা রাস্তা, মনে হচ্ছে রাস্তা গুলিয়ে আরও গভীর বনে ঢুকে পড়ছে। ইতিমধ্যে পিছন থেকে দুজোড়া পায়ের শব্দ আসছে, তার ওপর একটা কুকুরের গলার আওয়াজ পেল। ওরা প্রমাদ গনল, পিছনে কুকুর লেলিয়ে দিলে ধরা পড়া কেউ ঠেকাতে পারবে না। তবু দুজনে প্রাণপণে দৌড়তে লাগল। মাটিতে পড়ে শুকনো পাইন ফলের ওপর দিয়ে দৌড়তে গিয়ে পা ছিঁড়ে যাচ্ছে। তবে এখন সেসব ভাবার সময় নেই। ধরা পড়ার আগে যেভাবেই হোক এই জঙ্গলের বাইরে পৌঁছতে হবে। কিছুটা দৌড়ানোর পর সামনে থেকেও মানুষের গলার আওয়াজ আসতে লাগল। এবার ওরা হাল ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। বাঁচার আর কোনও উপায় রইল না। সামনে আর পিছন দুদিক থেকে তারা খাঁচাকলের মধ্যে আটকা পড়ে গেছে, এখন গাছের আড়ালে লুকোনোরও উপায় নেই। পিছন থেকে কুকুর এসে ঠিক তাদের খুঁজে বের করবে। অযুতা থরথর করে কাঁপছে, মুখটা আতঙ্কে সাদা হয়ে গেছে। মেয়েটা কি অজ্ঞান হয়ে যাবে! শরীরের সমস্ত ভারটা দিব্যর ওপর ছেড়ে চোখ বুজে ফেলেছে। এবার দিব্য খুব ভয় পেয়ে গেল। সামনের আওয়াজ ক্রমশ এগিয়ে আসছে। একবার ভাবল বাঁচার শেষ চেষ্টা হিসেবে প্রাণপণে বন্ধুদের নাম ধরে ডাকে, জায়গাটা ফার্মের কাছাকাছি হলে কারোর না কারোর কানে পৌঁছতে পারে। সেই ভেবে চিৎকার করে ডাকতে যাবে এমন সময় কে যেন তাদের নাম ধরেই ডাক দিল, বুকটা এতটাই ধড়ফড় করছিল যে প্রথম ডাকে সাড়া দিতে পারলো না, শুধু মুখ দিয়ে একটা গোঁ গোঁ আওয়াজ বেরোল। এমন সময় জঙ্গল ফুঁড়ে এগিয়ে এল তীর্থ, শাহিন, শ্রেয়াঙ্কা আর রাজবীর। দিব্যাংশ শ্রেয়াঙ্কর হাতে অযুতাকে ছেড়ে একটা গাছে হেলান দিয়ে হাঁফাতে লাগল। পর মুহুর্তেই পিছন থেকে জঙ্গল ভেঙ্গে দুজন লোক হাজির হল। একজনের হাতে একটা লাঠি, অন্যজনের একটা হাত কোমরে, নিশ্চয়ই ওখানে কোনও অস্ত্র লুকানো আছে। দুজনেই কঠিন চোখে ওদের দিকে তাকিয়ে রইল। এরমধ্যে যার পোশাক একটু ধোপদুরস্ত সে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞাসা করল, 'তুমহারা কৌন?' ওরা চারজন কিছু একটা ঘটে গেছে আন্দাজ করল, রাজবীর এগিয়ে এসে বলল, 'হমারা কলকাতা সে ফার্ম দেখনে কে লিয়ে আয়া, হমারা টিচার্স ভি সাথ আয়া, হাম সব কলকাত্তা কা কলেজ মে পড়তা হুঁ।'
'ফার্ম দেখনে কি লিয়ে আয়া তো ইধর কিঁউ! ইয়ে জাগা তো ফার্ম কা এরিয়া মে নেহি হ্যায়।' শ্রেয়াঙ্কা ব্যাপারটি তাদের বিরুদ্ধে যাচ্ছে বুঝে বলে উঠল, 'আঙ্কল, আসলে আমাদের একজন বলল এই জঙ্গলটা খুব সুন্দর, কিছুটা এগোলে নদীরও দেখা মিলবে। আর তাছাড়া গাছপালা, জঙ্গলের প্রাণী নিয়েই তো আমাদের পড়াশোনা ....তাই একটু ঘুরতে ঘুরতে এদিকে এসে পড়েছি।' 
পরের প্রশ্ন ধেয়ে এল, 'ওদিকে কে গিয়েছিল?'
ততক্ষণে অযুতা, দিব্য দুজনেই একটু সামলে উঠেছে। দিব্য ভালো মানুষের মত বলে উঠল, 'না না আঙ্কল আমরা তো কেউ ওদিকে যাইনি। আমরা তো গাছপালা দেখতে দেখতে জঙ্গলের মধ্যে রাস্তা হারিয়ে ফেলেছিলাম। এখন আপনার সাথে দেখা হয়ে গেল। আঙ্কল, প্লিজ বলুন না কিভাবে ফার্মে পৌঁছতে পারবো?' 
'জরুর কোই উধার গিয়া.... ম্যায় আওয়াজ শুনা!'
শাহিন বলে উঠল, 'চল চল আমাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে.... স্যার বকাবকি করবে!' ওরা পিছন ফিরতেই লোকটি চেঁচিয়ে উঠল, 'ঠায়রো....তোমরা গাছপালা দেখতে জঙ্গলে ঢুকেছো তো তোমাদের স্যার তোমাদের সঙ্গে নেই কেন?'
এই প্রশ্নটা আসবে কেউ ভাবেনি। তাদের মাথায় ছিল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই ভরা জঙ্গলের বিপদ থেকে পালাতে হবে, দিব্য আর জিতা নিশ্চয়ই কোনোও কাণ্ড ঘটিয়েছে। তীর্থ একটু রুক্ষ স্বরে বলে উঠল, 'আমরা কুড়িজন এসেছি, কাজ ভাগ করে একেকটা গ্রুপ একেক দিকে সার্ভে করছি, স্যার কতজনের সঙ্গে যাবে?' আর যাতে কোনও প্রশ্নের সম্মুখীন না হতে হয় তাই তড়িঘড়ি ফেরার পথ ধরল। পিছনে না তাকিয়েও বুঝতে পারল লোকদুটো তাদের দিকে তাকিয়েই আছে। তাদের বানানো কথা একবিন্দুও বিশ্বাস করেনি৷

বিভৎস আওয়াজটার উৎস নিয়ে তর্ক বেঁধে গেল। এখন রাত এগারোটা বেজে কুড়ি। দেবলীনা ম্যামের ঘরের মধ্যে মৃদু আলোয় ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে ওরা চারজন, রাজবীর, দিব্যাংশ, শ্রেয়াঙ্কা আর তীর্থ। অযুতাকে ইচ্ছে করেই ডাকা হয়নি। ওর শরীরটা ভালো নেই, সকালের শকটা এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি। দিব্যাংশ বারবার বলতে লাগল, তারা যে আওয়াজটা শুনেছে সেটা কোনও মানুষের, শুধু মানুষের নয় কোনও বাচ্চার আওয়াজ। প্রচণ্ড যন্ত্রণার সময় কেউ মুখ চেপে ধরলে এরকম বিকৃত আওয়াজ হওয়া সম্ভব। বাকি তিনজন বিভিন্ন ভাবে ক্রসচেক করতে চাইছে, আশপাশে কোনও স্লটার হাউস ছিল কিনা! গরু বা শুয়োর কাটার সময় এরকম আওয়াজ হতে পারে। দিব্যাংশ রেগে উঠল, 'তখন থেকে বলছি ওটা মানুষের আওয়াজ, বাচ্চার গলার আওয়াজ! তাছাড়া ওই জনমানবহীন জঙ্গলে ওই দুটো কটেজ ছাড়া আর কিছু নেই, তারপরই গভীর খাদের নিচে নদী, ওখানে কে শুয়োর কাটতে যাবে?’ এতক্ষন দেবলীনা ম্যাডাম চুপচাপ ছিলেন। খাটের উপর দুই হাঁটুর উপর থুতনি রেখে গভীরভাবে কিছু একটা ভাবছিলেন। এবার বলে উঠলেন, 'দুটো জায়গায় খটকা থেকে যাচ্ছে, এক, আওয়াজের আকস্মিকতা ও তীব্রতা, আর দুই হল লোকগুলোর দিব্য আর জিতার পিছু ধাওয়া করা। যদি রহস্য কিছু নাই থেকে থাকে তাহলে পিছু ধাওয়া করবে কেন?' সবাইকে কথাটা ভাবালো। সত্যি তো, যদি কোনও পশুর ডাকই হবে তাহলে লোকদুটো পিছন পিছন আসবে কেন! আর লোক দুটোর চোখের দৃষ্টি ক্রিমিনালদের মত ছিল। তাহলে তো দুয়ে দুয়ে মিলে পাঁচ নয় চারই হতে চাইছে - ডালমে জরুর কুছ কালা হ্যায়! দেবলীনা শুধোল,  ‘গণ্ডগোল কিছু একটা আছে ধরে নিলে এই মুহূর্তে তোমরা কি করতে চাও?'
পার্থ বলল, 'পুলিশে খবর দিলে হয়না?'
দেবলীনা বললেন, 'উহু! পুলিশকে জানানোর মত স্ট্রং এভিডেন্স আমাদের হাতে নেই। পুলিশকে জানালি, তারপর পুলিশ গিয়ে ওখানে কিছু পেলনা, তখন কেলেঙ্কারি হবে! ডি.এ স্যার তোদের সাথে আমারও গর্দান নেবে। এই মুহূর্তে কিছু করার নেই! তবু কেন যেন মনে হচ্ছে সিমলা থেকে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো একই সুতোয় গাঁথা! আর অপরাধের পথটা আমাদের রাস্তার সমান্তরাল পথে চলছে!' আলোচনার সাথে তাল মিলিয়ে রাত্রি বেড়ে চলল। কাল সবাইকে সকাল সকাল উঠতে হবে। দেবলীনা সবাইকে গুডনাইট জানিয়ে ঘরে ফিরে যেতে বললেন।

পরের দিনটা ব্যস্ততার মধ্যে কেটে গেল, এখান থেকে দশ কিলোমিটার দূরে বাসপা যেখানে ডানদিকে ঘুরে রকছামের দিকে বাঁক নিয়েছে সেখানে সার্ভে করতে গিয়েছিল। ওখানেই সারাটা দিন কেটে গেছে। নদীর তীরেই রান্না করে খাওয়া হয়েছে। পরেরদিনেও ঠাসা প্রোগ্রাম, সকালে বেরিয়ে ছিটকুলে সার্ভের কাজ সেরে কল্পা যাওয়ার পরিকল্পনা আছে। তাই ডিনার সেরে সবাই তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ল৷

ছিটকুলে গিয়ে যে পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হল তার জন্য কেউ মানসিকভাবে তৈরি ছিল না। জায়গাটি ছবির মত সুন্দর। আসার পথে রকছামের অনবদ্য সৌন্দর্য ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়। এইরকম এক জায়গায় এসে কাজের কথা সাময়িক ভুলে ছাত্রছাত্রীরা উচ্ছ্বাস চেপে রাখতে পারলো না৷ কিন্তু দিনের শেষে এই জায়গা যে এভাবে এক ভয়ংকর বিপদ বয়ে আনবে সেটা দেবোপম আচারিয়ার মত প্রবীণ, অভিজ্ঞ অধ্যাপকও বুঝতে পারেননি। সূর্য যখন অস্ত যাচ্ছে, শেষ সূর্যের কামরাঙা আলো ছিটকুলের আকাশ-বাতাস-অন্তরীক্ষকে মায়াবী আলোয় সাজিয়ে তুলছে, পশ্চিম আকাশে একাদশীর একফালি চাঁদ উঠেছে, তখন উন্মুক্ত আকাশের নিচে কনকনে ঠাণ্ডার মধ্যে মাথায় হাত দিয়ে একটা প্লাস্টিক চেয়ারে বসে আছেন দেবোপম আচারিয়া। পাশে শিবনাথ আর দেবলীনা, দূরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছাত্রছাত্রীরা। এতগুলো মানুষের মধ্যে এই অযুত অপার্থিব সৌন্দর্য চোখ তুলে দেখার মত কেউ নেই। সবাই মাথা নিচু করে আছে। মেয়েদের দঙ্গল থেকে মাঝে মাঝে ফোঁপানির আওয়াজ আসছে।

এইরকম সৌন্দর্য্যের আকর ভূমিতে তারা আগে কখনও আসেনি। চোখের সামনে দেখার পরও মনে হচ্ছে এটা সত্যি হতে পারেনা, নিশ্চয়ই স্বপ্ন। এখানে পৌঁছেই রাস্তা ধরে তারা পৌঁছে গেছে বাসপার তীরে। শিবনাথদার নির্দেশ কানে এসেছিল, 'কেউ বেশি দূরে যাবেনা, আর একঘণ্টার মধ্যে সবাই এখানে ফিরে আসবে।' স্বর্গভূমিতে পৌঁছে অযুতাও সব ভুলে অন্যদের সাথে মেতে উঠেছে। এখানে নদী তার নীল-সবুজ জল নিয়ে উচ্ছল, ওপারে পাইনগাছের সারি প্রাকৃতিক বাউন্ডারি তৈরি করেছে। ছেলেমেয়ের দল সুন্দরী বাসপাকে সামনে, পিছনে রেখে ছবি তোলার হুল্লোড়ে মেতে উঠল।

ছিটকুল হল ভারতের প্রান্তিক গ্রাম, এখান থেকে কিছুটা এগোলেই ভারত-তিব্বতের বর্ডার। নদীর পাড় ধরে বেশ কিছুটা এগোলে নদীর ওপর সুন্দর একটা কাঠের ব্রিজ। দিব্য, তীর্থ, অযুতা আর শ্রেয়াঙ্কা চারজনে ব্রিজ পেরিয়ে পাইনবনে ঢুকল। এদিকে বিস্তীর্ণ চরাচর জুড়ে রংবেরংয়ের ফুল ফুটে আছে, অনেকটা ঘাসফুলের মত, তবে সাইজে বড়। অন্যদিকে জঙ্গল ঘন হয়ে পশ্চিমদিকে বাঁক নিয়েছে। ওরা জঙ্গলের মধ্যে গিয়ে ঢুকল। কিছুটা এগোতে জঙ্গল আরও ঘন হল। হঠাৎ তীর্থ মুখে আঙুল দিয়ে সবাইকে চুপ করতে বলল। হাত তুলে দেখালো জঙ্গলের মধ্যে দুটো ট্রাক কাত হয়ে পড়ে আছে। এখানে তো গাড়ি আসার কথা নয়, গাড়ি চলার রাস্তাই নেই। ওরা কৌতূহলী হয়ে পড়ল, গাছপালার আড়াল থেকে সতর্ক নজর রাখল। কাউকে দেখা গেল না, এমনকি কোনও শব্দও নেই। নদীর শব্দ কানে আসছে না, তার মানে অনেকটা ভিতরে চলে এসেছে। এদিকে সময় বয়ে যাচ্ছে, একঘণ্টার কড়ার দ্রুত শেষ হতে চলেছে, ওরা অধৈর্য হয়ে উঠল। কিছুক্ষণ পর শুকনো পাতা মাড়ানোর আওয়াজ কানে এল। উল্টোদিক থেকে একটা লোক গাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে, হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। গাড়ির কাছে এসে দ্রুত কয়েকটা টান মেরে সিগারেটটা ফেলে গাড়িতে উঠে বসলো। পরমুহুর্তে আরেকজন খইনি ডলতে ডলতে প্রথম লোকটাকে কিছু বলল, তারপর সেও দ্বিতীয় গাড়িটায় উঠে ইঞ্জিন স্টার্ট করল। কিছু বুঝতে না পেরে ওরা গাড়িদুটোর পিছু ধাওয়া করলো। খুব জোরে দৌড়তে হচ্ছেনা, কারণ রাস্তা না থাকায় গাড়িগুলোকেও গাছপালার ফাঁক দিয়ে আস্তেআস্তেই যেতে হচ্ছে। প্রায় পাঁচশো মিটার যাওয়ার পর গাড়িগুলো থামলো। গাছের আড়াল থেকে গলার আওয়াজে বুঝল এখানে আরও অনেক লোক আছে৷ মোটা গলায় কেউ চেঁচিয়ে উঠল, 'এ লছমি, এ লাজবন্তী, সবকো লে আও! এরপর যেটা ঘটল সেটা দেখে উনিশ-কুড়ি বছরের চারজন কিশোর-কিশোরীর বুক হিম হয়ে গেল। চোখের সামনে দেখতে পেল একটার পর একটা বাচ্চাকে নিয়ে এসে ট্রাকের পিছনে তোলা হচ্ছে। দুজন মহিলা তাদের হাত ধরে আনছে, বাচ্চাগুলো কেমন নেশাগ্রস্তের মত এগিয়ে ট্রাকে গিয়ে উঠছে, কেউ কোনও প্রতিবাদ করছে না। ভয়ানক কিছু একটা ঘটছে বুঝতে পেরে ওরা গুঁড়ি মেরে এগোতে লাগল। এরপর একটা ঘটাং করে আওয়াজ হল আর নিমেষের মধ্যে বাচ্চাগুলো ভ্যানিশ হয়ে গেল। ওরা চমকে উঠল, আরে এটা ম্যাজিক নাকি! দিব্য ফিসফিস করে বলল, 'ট্রাকের দুটো চেম্বার আছে, একটা হিডেন, এবার ওপরের চেম্বারে হাবিজাবি মাল চাপিয়ে পুলিশের চোখে ধুলো দেবে'। দ্বিতীয় গাড়িতেও একই কায়দায় বাচ্চাগুলোকে তুলে ঢেকে দেওয়া হল, এবার দিব্যর কথা সত্যি করে গাড়িতে প্রচুর চেরাই কাঠের তক্তা তোলা হতে লাগল। এখন কি করবে বুঝে উঠতে পারছেনা, তবে এটা বুঝতে পারছে যা করতে হবে সেটা এক্ষুনি করতে হবে। গাড়িগুলো একবার চোখের বাইরে চলে গেলে কিছু করার থাকবে না। ওরা অনেকদূর চলে এসেছে, এখানে কোথায় থানা তাও জানা নেই। তাই যা করতে হবে নিজেদেরই করতে হবে। ঠিক সেইসময় গাড়িদুটো চলতে শুরু করল। আর কিছু না ভেবে চিৎকার করতে করতে গাড়িদুটোর পিছনে ছুটতে লাগল।

একে একে চারজনের জ্ঞান ফিরল, বুঝতে পারল তারা বন্দি। ঘটনাটা একদম গোয়েন্দা গল্পের মত ঘটছে। প্রথমে কোথায় আছে বুঝতে পারল না। চারদিকে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার, দরজা জানালার আভাসও পেলনা। আস্তে আস্তে সবাই উঠে বসল। শরীরে প্রচণ্ড ক্লান্তি, নিশ্চয়ই ক্লোরোফর্ম জাতীয় কিছু দিয়ে অজ্ঞান করা হয়েছিল। দিব্য ফিসফিস করে বলল, 'মনে হচ্ছে মাটির নিচে কোনও গুহার মধ্যে আটকে রেখেছে’। গাড়ির পিছনে দৌড়ানোর পর জঙ্গল ফুঁড়ে কয়েকটা লোক এসে ওদের চারজনকে পিছমোড়া করে নাকের ওপর রুমাল চেপে ধরেছিল। অজ্ঞান করে ওদের এখানে ফেলে রেখে গেছে। তখন প্রচণ্ড তাড়াহুড়ো ছিল, নিশ্চয়ই ফিরে এসে ওদের ব্যবস্থা করবে। তার আগেই এখান থেকে বেরোনোর উপায় খুঁজতে হবে। অযুতা ডুকরে কেঁদে উঠে বলল, 'ওই বাচ্ছাগুলোর কি হবে? ওদের তো বাঁচাতে পারলাম না!' শ্রেয়াঙ্কা অন্ধকারে বন্ধুর পিঠে হাত রাখল, 'ধৈর্য ধর অজু, সেজন্যই আমাদের এখান থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বেরোতে হবে।' তীর্থ আবিষ্কার করল, ঘরে কোনও জানলা দরজা নেই, তবে ছাদের দিক থেকে একটা ক্ষীণ আলো আসছে। অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে দেখল একটা দড়ির মই ঝুলছে। এবার বিষয়টি পরিষ্কার হল, এটা একটা পাথুরে গুহা, দুষ্কৃতিমূলক কাজের জন্য ব্যবহার হয়। গুহার মুখে পাথর চাপা দেওয়া, বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই। ওদের নিশ্চয়ই অজ্ঞান অবস্থায় উপর থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। নিচে মোটা করে পাতা বিছানো থাকায় সেভাবে কেউ চোট পায়নি। কিন্তু এখন এখান থেকে বেরোনোর কি উপায়? তীর্থ দড়ির মই বেয়ে উপরে উঠে দেখে এসেছে বিশাল ওজনের কোনও পাথর দিয়ে গুহার মুখটা ঢাকা, ভিতর থেকে কোনওভাবেই সরানো সম্ভব নয়। তাছাড়া বাইরে নিশ্চয়ই পাহারা আছে। এখান থেকে শত চেঁচিয়েও কোনও লাভ নেই, বিজন জঙ্গলে মাটির নিচের এই অন্ধগুহা থেকে চিৎকার করলে কারোর কানে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। 

সন্ধ্যে ঘনিয়ে আসছে, তার সাথে বেড়ে চলেছে ঠান্ডা। এই ঠান্ডায় খোলা আকাশের নিচে এতগুলো অসহায় মানুষকে দেখে এক বাঙালি হোটেল মালিক এগিয়ে এলেন। দেবোপমবাবু রাজি হলেন না তবে বাচ্চাগুলোকে ওই ভদ্রলোকের সঙ্গে যেতে বললেন, সঙ্গে দেবলীনা আর মিনতি। শিবনাথ তার সঙ্গে রয়ে গেল। চারটে বাচ্চা মিসিং, এর পরিণতি কী হতে পারে ভেবে শিউরে উঠছেন প্রৌঢ় অধ্যাপক। কলকাতায় এখনও কিছু জানানো হয়নি, তবে খবরটা আর কতক্ষণ আটকে রাখতে পারবেন জানেন না। প্রতিদিন রাতে বাচ্চাগুলোর বাড়ি থেকে ফোন আসে৷ এখানকার পুলিশ আশ্বাস দিয়েছেন, কল্পা থেকেও একগাড়ি পুলিশ এসেছে। তাছাড়া বর্ডার এলাকা হওয়ায় বিএসএফের লোকেরাও এই সার্চে অংশ নিয়েছে। এখানকার প্রশাসন সন্দেহ করছে ব্যাপারটিতে আন্তর্জাতিক পাচার চক্রের হাত আছে। তাই পুরো বর্ডার জুড়ে ছানবিন চলছে।

অনেকক্ষণ কেটে গেল, কিছুই ঘটলো না। কিছু করতে না পারার আফশোষে চারটে ছেলেমেয়ে অন্ধকারের মধ্যে ফুঁসতে লাগল। খিদে তো পেয়েছেই, এবার নিঃশ্বাসে কষ্ট টের পেতে লাগল। এই অন্ধকূপে অক্সিজেন আস্তে আস্তে কমে আসছে। অযুতা ঝিমিয়ে পড়েছে, শ্রেয়াঙ্কা ওকে চাঙ্গা রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু আর কতক্ষণ! কতক্ষণ ধরে এই বয়সী বাচ্চারা স্নায়ুর সাথে যুদ্ধ চালাতে পারবে! এমন সময় একটা মৃদু আওয়াজ কানে এল। ওরা চমকে উঠে বসল, এমনকি অযুতাও। অন্ধকারে ওদের মুখে একই সাথে ভয় ও ভরসার ছবি খেলে গেল। ওপর থেকে একটা শব্দ আসতে লাগলো। চারজন দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে ওপরের পানে তাকিয়ে রইল। ঘসটানির শব্দ বাড়ার সাথে সাথে হালকা আলোর রেখা চোখে পড়ল৷ কেউ একটা গুহার মুখের পাথরটা সরানোর চেষ্টা করছে! ওদের লোক হলে তো এতক্ষণ সরিয়ে ফেলার কথা, তাহলে কি অন্য কেউ? তীর্থ কাউকে কিছু না বলে দড়ির মই বেয়ে উঠতে শুরু করল। শ্রেয়াঙ্কা চেঁচিয়ে বারণ করল। তীর্থ বলল, ‘যেটা হতে চলেছে সেটাকে তো ফেস করতেই হবে, আগে আর পরে!’ এই বলে মই বেয়ে উঠতে লাগল। শেষ ধাপে উঠে একহাতে দেওয়ালের সাপোর্ট নিয়ে অন্য হাতে পাথরটা নিচ থেকে ঠেলতে লাগল। এতে কাজ হল, আগের থেকে দ্রুতগতিতে আলোর পরিসর বাড়তে লাগল। একটা সময় ইঞ্চি ছয়েকের মত ফাঁক হতে একটা বাচ্চার মুখ দেখা গেল। বাইরের আওয়াজ শুনে বুঝল, একজন নয়, বেশ কয়েকজন আছে। নিচের তিনজন উঠে দাঁড়ালো। তীর্থ নতুন উদ্যমে ঠেলতে লাগলো। একটা সময় চারজন গুহার বাইরে এল। আদিবাসী বাচ্চা, পাহাড়ের উপর থেকে নীচে ছাগল চরাতে নিয়ে আসে। এখানে একটা গুহা আছে এবং দুষ্টু লোকগুলো সেই গুহাটাকে খারাপ কাজে ব্যবহার করে সেটা ওরা জেনেছে। কিন্তু ভয়ে এদিকে আসত না। কয়েকদিন আগে একটা ছাগল দিক ভুলে এদিকে চলে এসেছিল তখন ওরা দেখে কয়েকজন লোক একদল বাচ্চাকে গুহার মধ্যে পুরে ওপরে পাথর চাপা দিয়ে চলে গেল। তারপর থেকে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে এখানে রোজ আসে, কিন্তু বাইরে সবসময় দু-তিনজন লোক বন্দুক হাতে পাহারায় থাকে বলে কাছে আসতে পারে না। আজকেও গাড়ির আওয়াজ পেয়ে বাচ্চাগুলো এদিকে দৌড়ে এসেছিল। গাছের আড়াল থেকে তখনই তারা দেখেছে কিভাবে গুন্ডাগুলো দিব্যদের ধরে গুহায় ফেলে দিয়েছিল। আজ ওরা এ জায়গা ছেড়ে যায়নি। ওরা বুঝেছিল দিব্যরা ভালো মানুষ। এতক্ষণ দুজন পাহারায় ছিল, কিছুক্ষণ আগে ওরা স্নান করতে নদীর দিকে যেতেই ওরা পাথরটা সরানোর চেষ্টা করে। ওরা বাচ্চাগুলোকে ধন্যবাদ দিয়ে জিজ্ঞাসা করলো সকালে গাড়িগুলো কোনদিকে গেছে! বাচ্চাগুলো যেদিকে আঙুল তুলে দেখাল সেদিকের জঙ্গল আরও গভীর। ওরা সময় নষ্ট না করে সেদিকে দৌড়তে থাকে। এখন ধরার কোনও প্রশ্ন নেই, কিন্তু যদি কোনও ক্লু পাওয়া যায়। জঙ্গলের গাছপালার মধ্যে দিয়ে ছোটা সহজ নয়, তবু ট্রেকারের চাকার দাগ নজর করতে করতে যতটা সম্ভব জোরে চলতে লাগল। কদিন আগে বৃষ্টি হওয়ায় তাদের সুবিধে হল, বেশ কিছুটা যাওয়ার পর নদী পথরোধ করল। তবে নদী এখানে সংকীর্ণ এবং অগভীর। নদীর কিনারায় এসে চাকার দাগ থেমেছে, তার অর্থ ট্রেকার নদী পেরিয়েছে। এদিকটা একদম শুনশান, পাহাড়ের একটা অংশ একটু বাঁক নিয়ে প্রাকৃতিকভাবে আড়াল তৈরি করেছে। মূল রাস্তা থেকে জায়গাটা দেখা যায়না, ফলে লোকের চোখের আড়ালে সবকিছুই করা সম্ভব। ওরা হাত ধরাধরি করে নদীটা পেরিয়ে গেল, আবার জঙ্গল শুরু হল এবং গাড়ির চাকার দাগ নতুন করে মিলল। ওরা বুঝতে পারল ওরা ক্রমশ বর্ডারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। চারজনেরই বুক ছ্যাঁত করে উঠল, গাড়িগুলো যদি বর্ডার পেরিয়ে যায় তাহলে আর কোনওভাবেই ওদের ধরা যাবে না! আরও কিছুটা এগোতে গাড়িদুটো চোখে পড়ল৷ 

আধঘন্টা হয়ে গেল ওরা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে নজর রাখছে৷ দূরে একটা পুরোনো ভাঙাচোরা বাড়ি দেখা যাচ্ছে, পাঁচিলের বাইরে জঙ্গলের সাথে মিশে দাঁড় করানো সকালের গাড়ি দুটো। বুঝল দুষ্কৃতীরা আশেপাশেই আছে। ছেলেমেয়েগুলোর কোনও হদিশ নেই। কারোর চোখে পড়ে যাওয়ার ভয়ে ওরা জঙ্গলের মধ্যে শুয়ে পড়ল, কোনওভাবেই ধরা পড়া চলবে না।  দিব্য হঠাৎ করে দেখতে পেল সকালের ড্রাইভার দুটো এদিকেই আসছে। চারজনে নিঃশ্বাস বন্ধ করে মাটির সাথে মিশে শুয়ে রইলো। লোকদুটো আরেকটু এগিয়ে শুকনো পাতার উপর জলবিয়োগ করতে লাগলো। ঘেন্নায় শরীর রি রি করে উঠলেও মুখ দিয়ে একটা শব্দও বের করলনা। তবে দুজনের কথাবার্তায় ওদের লাভ হল, ওরা বুঝলো ওদের আজকের অভিযান ফেল করেছে। পুলিশ আর বিএসএফের অতিরিক্ত নজরদারির জন্য আজ বর্ডার পেরোতে পারেনি। দুজনেই উষ্মা প্রকাশ করছে, ঝামেলা মিটে গেলে আজই বাড়ি ফিরতে পারতো, তা না উটকো ঝামেলার জন্য এই জঙ্গলে আরও একটা রাত কাটাতে হবে! 
একজন শুধালো, ‘আমাদের কি আবার গাড়ি নিয়ে আগের ডেরায় যেতে হবে?’
‘কেন?’
‘আরে, সকালের ওই বাচ্চাগুলোর ব্যবস্থা করতে হবে না! এর মধ্যে তো পুলিশও পিছনে লেগেছে!’
‘হ্যাঁ ঠিক! বসের এখন শাঁখের করাত! এদিকে এই বাচ্চাগুলোর বিলিব্যবস্থা করে উঠতে পারছে মা, ওদিকে এই বাচ্চাগুলো পিছনে হুড়ো দিচ্ছে। এর মধ্যে শালা আমরা না ফেঁসে যাই।‘
লোক দুটো চলে যেতে ওরা নিজেদের কর্তব্য সম্বন্ধে সম্যক ওয়াকিবহাল হয়ে উঠল। ঠাকুর তাদের হাতে একটা দিন সময় দিয়েছে। এর থেকে বড় আশীর্বাদ আর কি হতে পারে! এখন এই জঙ্গল থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বেরোতে হবে। পৌঁছতে হবে স্যার-ম্যাডামেদের কাছে, বন্ধুদের কাছে। বাচ্চাগুলোকে যেকোনও মূল্যে বাঁচানোর প্রতিজ্ঞা নিয়ে ওরা ফেরার পথ ধরল। 

এখন রাত দুটো। প্রথমা তিথির একফালি চাঁদ নির্মল আকাশে সাধ্যমতো আলো ছড়িয়েছে। কাঁচের জানালার পর্দা সরানো। ওদের ইচ্ছে ছিল ছাদে গিয়ে সোনালী ছিটকুলের সৌন্দর্য চোখ ভরে উপভোগ করার, দেবলীনা ম্যাডাম চোখ পাকিয়ে স্যারের ঘরের দিকে আঙুল তুলে শাসিয়েছে। আজ ডিএ স্যারকে সত্যিই খুব ক্লান্ত দেখা দেখাচ্ছিল। কয়েকঘন্টার মানসিক উৎকণ্ঠায় বয়স যেন দশ বছর বেড়ে গেছে। সেই বাঙালি হোটেল মালিক ভদ্রলোক অত রাতে আর কল্পায় ফিরতে দেননি। নিজের হোটেলের প্রতিটা ঘর খুলে দিয়েছেন। রাতে খিচুড়ি আর ডিম ভাজা খাইয়েছেন, একদম বিনা পয়সায়। সন্ধ্যেবেলা হোটেলের ডাইনিংয়ে যখন ছিটকুল এবং কল্পা থানার পুলিশ অফিসাররা ওদের ধন্যবাদ দিতে এলেন তখন স্যারকে একটা কথাই বলেছেন- 'আমরা আপনার ছাত্রদের জন্য গর্বিত, গোটা দেশ গর্বিত। ওদের উপস্থিত বুদ্ধি আর সাহসের জোরে একটা আন্তর্জাতিক পাচার চক্রকে ধরা সম্ভব হয়েছে। এটা সম্ভব হয়েছে আপনাদের মত শিক্ষকদের নিরলস সুশিক্ষা দানের কারণে। স্যার আপনাকে স্যালুট!’ এই বলে সব পুলিশ অফিসার একযোগে স্যারকে স্যালুট জানিয়েছেন। সেই মুহূর্তে শত ক্লান্তির মধ্যেও মানুষটার মুখের গর্বের হাসি আর চোখে চিলতে জলের আভাস কারোর নজর এড়ায়নি। এরপর হয়ত চোখের জল লুকোতেই নিজের ঘরে চলে গেছেন। শিবনাথদা রাতে খেতে এসে বলল, 'ঘরে ঢুকে উনি শুয়ে পড়েছেন এবং সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়েছেন। একটা রাত না খেলে কিছু হবে না। কেউ ডেকোনা, ওনাকে ঘুমোতে দাও।'

XXXXX

গৌতম সরকার

নন্দীবাগান, সিংঘি গার্ডেন, কলকাতা।

শেয়ার করুন:
মন্তব্যসমূহ (0)

এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। যেসব ঘর পূরণ করা বাধ্যতামূলক, সেগুলোতে * চিহ্ন দেওয়া আছে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন