খান মঞ্জিল
আমার উল্টো দিকে ঠিক মুখোমুখি আসনে বসা লাবণ্যে ভরপুর ভারতীয় বংশোদ্ভূত সুন্দরী যুবতীটি ব্রডভিও স্টেশনে নেমে গেলে প্রায় পঞ্চাশ আসনের এই কামরাটায় এখন চারজন মাত্র যাত্রী! ডান দিকের শেষ প্রান্তে একজোড়া তরুণ-তরুণী আর এদিকটায় আমার কোনাকুনি অবস্থানে বসা ঐ ভদ্রলোক। বয়স ষাটোর্ধ নিশ্চয়ই। বড়সড় শক্ত গড়ন। আধা পরিচ্ছন্ন পরিধান। মাথায় মানানসই একটি বেরেট হ্যাট। কামরার এতগুলো শূন্য আসন যাত্রীহীনতায় হতাশ না স্বস্তিতে আছে এমন একটি প্রশ্ন মস্তিষ্কে ঝিলিক দিয়েই আবার হারিয়ে গেল!
মধ্য রাতের পর থেকেই টরন্টো শহরের উপর দিয়ে বড় রকমের একটা তুষার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। স্কুল কলেজ সব বন্ধ, অনেক অফিস আদালতও। ধূসর স্মৃতির মতো রাস্তাঘাটে দু-একটি গাড়ী এবং অল্পস্বল্প মানুষজন দেখা যায়। বিকল্প ব্যবস্থা থাকলে এমন আবহাওয়ায় সাধারণত কেউ গাড়ী বের করে না। আমিও তাই বহু বহুদিন পরে মধ্যাহ্নের এই ট্রেনে যাত্রী হয়ে বসেছি। প্রায় শূন্য কামরা। এ ধরনের সময়গুলোতে আমি সাধারণত অর্ধনিমীলিত চোখে তৃতীয় দুয়ার খুলে অন্যলোকে ডানা মেলি! কিন্তু আজ সেই মনোযোগে ছেদ পড়ছে।
আমার এক স্টেশন পরেই বেরেট হ্যাটের ঐ ভদ্রলোক কামরায় আসেন। ইয়ং-ব্লোর স্টেশনে কয়েকজন যাত্রী নেমে যাওয়ার পরেই বিষয়টা লক্ষ্য করি। লোকটা অনর্গল তার ডান হাতের তর্জনী নাড়িয়ে এমন একটা ভঙ্গি করে কথা বলে যাচ্ছেন মনে হচ্ছে প্রাণপণে কাউকে যেন কিছু বুঝানোর চেষ্টা চলছে। আঙুলের নির্দেশনা একেবারে উল্টো দিকের আসনের প্রতি। তার ঠোঁট নড়ছে কিন্তু কোনো শব্দ নেই! ভাবভঙ্গিতে কখনো মনে হচ্ছে একজন প্রভাষক যেন তার ছাত্রদের উদ্দেশ্যে কোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বক্তৃতা দিচ্ছেন! ভাগ্যিস আমি সরাসরি তার সামনের আসনে নই। তাহলে নিজেকেই হয়তো তার ছাত্র বলে মনে হতো! আমি তার দিকে নিমেষ তাকিয়ে চোখ আবারও অর্ধনিমীলিত করে ফেলি। কিন্তু আজকে তৃতীয় দুয়ারটি কোনোভাবেই খুলতে পারছি না!
তথাকথিত সুপালিত সভ্যতার এই সমাজে এ ধরনের আচরণের মানুষদের নিয়ে মস্তিষ্ক প্রথমেই যে সিদ্ধান্তটি নিয়ে ফেলে তা হলো…! আজ থেকে বছর পঁচিশ পূর্বে হ'লে আমিও হয়তো চট করে এমনি কিছু ভেবে বসতাম। তবে এখন আর তেমনটি হয় না! শিখিয়ে দেয়া প্রথাগত বোধ-বুদ্ধিতে এ ধরনের একজন মানুষকে আমরা অবলীলায় মাথা খারাপ বলে আখ্যা দিয়ে দেই। কিন্তু যে মানুষগুলো দিনের পর দিন দুর্নীতি করে যাচ্ছে, অন্যের হক মেরে খাচ্ছে, অনবরত হিংসা-প্রতিহিংসায় ডুবে থাকছে, সীমাহীন জাগতিক লোভ-লিপ্সা চরিতার্থ করার জন্যে অন্যের প্রাণ নির্বিঘ্নে সংহার করছে তাদেরকে কখনো আমরা মাথা খারাপ বলি না! বয়স বাড়লে জীবন বোধের কিছু কিছু বিষয়ে নিজেকে বিচারকের আসনে বসিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতাটা লোপ পায় হয়তো। আর সেখানে বাড়তে থাকে প্রশ্ন, বাড়তে থাকে জীবন জিজ্ঞাসা। তাই এ সমাজে এখন আর কাউকে যেন পাগল বলে ভাবতে পারি না। শুধু মনে হয় ও ওর মতো আছে আর আমি আমার মতো।
হাত উঁচিয়ে অনর্গল তর্জনী এবং ঠোঁট নাড়িয়ে শব্দহীন ভাবে কথা বলে যাওয়া এই ভদ্রলোক সম্পর্কে এইটুকু ছাড়া আর কিছুই তো জানি না। পরের কোনো একটি স্টেশনে নেমে যাওয়ার পরে হয়তো কোনোদিনই আর তার সাথে আমার দেখা হবে না। ঠিক এই মুহূর্তেও কী ধরনের বিষয় তার মস্তিষ্ক জগৎকে আলোড়িত করছে সে সম্পর্কেও আমার নূন্যতম কোনো ধারণা নেই। সুতরাং এটুকু দেখেই তাকে মস্তিষ্ক বিকৃতির দলে কী করে ফেলি?
মাথার মধ্যে ভাবনার এইসব জটলাকে পাশ কাটিয়ে হঠাৎ করেই মনটা বহু বছর পিছনে চলে গেল। ঐ সময়টায় বিশেষ একটা কারণে বেশ কিছুদিন একটি জেলা শহরে ছিলাম। শহরটির আবাসিক এলাকার রাস্তা ধরে হাঁটতে আমার বেশ ভালো লাগতো। ঘন সবুজে ঢাকা এলাকাগুলোয় বৃক্ষরাজির ফাঁক ফোঁকর গলে দুপাশে মাথা তুলে দাঁড়ানো একতালা দোতলা বাড়ি এবং তার মাঝ দিয়ে সরীসৃপের মতো এঁকেবেঁকে যাওয়া নিপাট পিচ ঢালা রাস্তা, দারুণ মনোরম! প্রতিদিন বিকেলটায় তাই আমি অনেকটা পথই হেঁটে যেতাম। রাস্তার পাশের এই বাড়িগুলোরই একটি হলো খান মঞ্জিল। সাদা রংয়ের দোতলা বাড়ি। দেখলেই বুঝা যায় সম্পন্ন পরিবার। তবে যে বিষয়টি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করতো তা হ'লো প্রায়শই দোতলার একটি রুমে জানালার শিক ধরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন যুবতী কিংবা মহিলা। এলোমেলো উসকোখুসকো চুলের দুর্ভেদ্য জঙ্গল ভেদ করে বেরিয়ে আসা ভীষণ রকম সুশ্রী একখানা মুখমন্ডল! তার দৃষ্টি!? হয়তো সেখানে কিছুই নেই, হয়তো তার ভাষা সীমাহীন গহীন! শুধু দেখতাম। কিন্তু তার পাঠ উদ্ধার করার ক্ষমতা বিধাতা আমাকে দেননি! তবে তার সম্পর্কে জানার কৌতূহল নিবৃত্ত করতে না পেরে অবশেষে একদিন বুলবুল ভাইকে জিজ্ঞেস করে বসলাম। বুলবুল ভাই এলাকারই লোক। ভালো তবলা বাদক। একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তার সাথে আমার প্রথম পরিচয়। সেই থেকে কিছুটা ঘনিষ্ঠতা।
বুলবুল ভাইয়ের পিতৃদত্ত নাম ছিল সুব্রত কুমার। এলাকার প্রতাপশালী লোক আনিস সাহেবের মেয়ে লিনার সাথে প্রেমের বন্ধনে বাঁধা পড়েন। এবং তা থেকেই ধর্মান্তর এবং পূর্ব নামের বিলুপ্তি! কিন্তু সামাজিক কৌলিন্য এবং সংস্কারের বিরুদ্ধে তাদের প্রেম যুদ্ধের সমাপ্তি তাতেই হয়নি। সে আরেক বড় গল্প! ঐ যুবতী কিংবা মহিলাটি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে মুহূর্ত নীরব থেকে তিনি বললেন,
“তুমি কি খান মঞ্জিলের কথা জিজ্ঞেস করছো?”
বললাম, “জ্বী”।
ছোট একটা দীর্ঘশ্বাস টেনে বুলবুল ভাই বললেনঃ “উনি ঝর্ণা আপা। আমাদের বছর দুয়েকের সিনিয়র। একসময়ে এ শহরের শ্রেষ্ঠ নৃত্য শিল্পী ছিলেন। গানও ভালো গাইতেন। ধ্রুপদী। ইন্টার পাশ করার পরেই পারিবারিক সিদ্ধান্তে পাশের জেলার এক সিভিল সার্ভেন্ট অফিসারের সাথে বিবাহ হয়। শোনা যায় বাসর রাতেই অফিসার বরটি তাকে নাচতে বলেন। ঝর্ণা আপা সেই আদেশ পালনে অস্বীকৃতি জানালে শুরু হয় তর্ক। এক পর্যায়ে তা শারীরিক প্রহারে রূপ নেয় যার প্রধান হাতিয়ার ছিল প্যান্টের বেল্ট! নিয়মমাফিক দু'দিন পরে তারা ঝর্ণা আপার বাবার বাড়িতে এলে তিনি সব খুলে বলেন মাকে এবং বরের সাথে আর ফেরত যেতে চাননি। কিন্তু সেই গতানুগতিক যাকিছু বলা হয় আর কী! ভালো পরিবার(?), যোগ্য(?) ভালো ছেলে(?), সমাজে পরিবারের সম্মান…! ধৈর্য্যের সাথে একটু মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা কর! সময়ে সব ঠিক হয়ে যাবে! আপা হয়তো চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মাস ছয়েকের কিছু পর থেকেই তার শ্বশুরালয় থেকে খবর আসতে থাকে ঝর্ণা আপার মস্তিষ্কে সমস্যা আছে সুতরাং তারা তাকে ফিরিয়ে দিতে চায়!”
এই পর্যন্ত বলে বুলবুল ভাই একটু থামলেন। তার কন্ঠ ভারী! হয়তো কয়েকমুহূর্ত তিনি তার নিজের প্রেম যুদ্ধ সময়ে ডুবে গেলেন! তারপর আবার বললেন, “এলাকায় ঝর্ণা আপা এখন একজন পাগলিনী বলেই পরিচিত! শুনেছি পরিবার তাকে ঢাকায় নিয়ে বেশ কিছুদিন ভালো একজন মনোচিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে রেখেছিল। কিন্তু ফলাফল তো তুমি দেখছোই!” সবটা শুনে আমার কন্ঠে আর কোনো ভাষা ফুটলো না!
বেঁচে থাকলে ঝর্ণা আপা হয়তো এখনো সমাজের কাছে এক পাগলিনী মহিলা হয়েই আছেন! যার কারণ, যার ইতিবৃত্তের সত্যতা শুধুমাত্র খান মঞ্জিলের চার দেয়ালের মাঝেই দীর্ঘশ্বাস হয়ে ঘুরপাক খায়! সুশীল(?) এই সমাজের বাতাস সেই সত্যকে উড়িয়ে নিয়ে গেছে কালের গহ্বরে! তার সেই ঝলমলে অতীতকে কেউ তাই আর মনে রাখে না! হয়তো ঝর্ণা আপাও আজ আর কিছুই বলতে পারবেন না কেন তার এই…!? জানেন না জানালার ফাঁক গলে দেখতে পাওয়া ঐটুকু আকাশে কী তিনি খুঁজে ফিরেন! আর তার সেই বর অফিসারটি? ও জানার ইচ্ছে আমার আর হয়নি। তবে পাঠকেরা নিশ্চয়ই জানেন এরা কখনো পাগল নয়। এ সমাজে এরা কখনো পাগল আখ্যা পায় না!
অতীত থেকে ফিরে আসা এক ঝাপটা বাতাস আমার তৃতীয় দুয়ারটি হয়তো খুলেই দিয়েছিল কিছুটা! কারণ কিছুক্ষণ পরে চোখ মেলে দেখি কোনাকুনি বসা বেরেট হ্যাটের সেই ভদ্রলোকের আসনটিতে বসে আছেন আরেক যুবক! গড়নে ককেশীয় বলেই মনে হয়। সবটা কামরায়ই দৃষ্টি ঘুরালাম। ছড়িয়ে ছিটিয়ে আরও তিনটা নূতন মুখ কিন্তু সেই ভদ্রলোক কোথাও নেই। নিশ্চয়ই নেমে গেছেন কোনো একটি স্টেশনে। আমিও নেমে যাবো পরের স্টেশনে। হয়তো আর কোনোদিনই বসা হবে না এই আসনটিতে!
ট্রেন চলছে। চলবে এভাবেই।—
শূন্য আসন পূর্ণ করবে অন্য কেউ!
XXXXX
টরোন্টো নিবাসী বাঙালি কবি, গল্পকার ও প্রাবন্ধিক। তাঁর লেখা প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অন্ধ’।
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!