অগ্নিশলাকা
মাঘ মাসের ভোর। ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন চারদিকে। কয়েক হাত দূরের বস্তুও ঠিকমতো দেখা যায় না। রামা হাতে একটা জলভরা জেরিক্যান নিয়ে চলেছে বদ্যিদের জঙ্গলে। প্রাতঃকৃত্য সারতে। সরকারি টাকায় বাড়িতে একটা পায়খানা বসেছে, কিন্তু তাতে শান্তি পায় না রামা। এতকালের অভ্যেস কি হুট করে তাড়ানো যায়? তাই এখনও সুযোগ পেলেই ছুটে যায় পুরনো জায়গা বদ্যিদের জঙ্গলে। তবে অবশ্যই বৌ শান্তিবালার নজর এড়িয়ে। যদিও তার নাম শান্তিবালা , কিন্তু শান্তি নষ্ট করতে জুড়ি মেলা ভার। অন্তত এই বিষয়টায় তার মুখ খুব চলে। আবেগটাই বুঝতে পারে না।
আজ বড় সুযোগ পেয়েছে রামা। ঘুম ভাঙতেই দেখল, লেপের তলায় মুখ ডুবিয়ে খুব আরাম করে ঘুমোচ্ছেন শান্তির অবতার! বাঁশির সুরে নাকও ডাকছে একটু। শীতের ভোরের এই ঘুম বড় মহার্ঘ্য জিনিস, সহজে কেউ ছাড়তে চায় না। এই সুযোগ। বিছানার জট-জুট ছাড়িয়ে উঠে এল রামা। বাইরে বেরিয়ে দেখল, আলো ফুটতে অনেক দেরি। শান্তিবালা ওঠার আগেই কাজ সেরে আসা যাবে। দরজা ভেজিয়ে নিঃশব্দে বারান্দা থেকে নেমে এল। এক কোণে রাখা ফাঁকা পেট্রোল জেরিক্যান বের করল। জল ভরলো বাড়ির বাইরের পুকুর থেকে।
মঙ্গলপুরের ঘরে ঘরে পাকা পায়খানা বানানোর কাজ শুরু হয়েছে অনেকদিন আগেই। সরকারি প্রকল্প। সরকারিবাবুরা মাঝে মাঝে এসে প্রচার চালায়। খোলা জায়গায় ওসব করতে নেই, রোগ জীবাণু ছড়ায়। শান্তিবালা প্রথম লটেই আবেদন করেছিল। রামা ও ওর বাবা রহিতাশ্ব চেয়েছিল, আগে সবার হোক তারপরে আমরা ধীরে সুস্থে বানাব। বাপ ঠাকুরদার আমল থেকে চলে আসা একটা সিস্টেম বলে কথা। তাঁরা তো দিব্যি সুস্থ ছিলেন, তখন তো রোগ ছড়ায় নি? কিন্তু শান্তিবালার খুব মুখ, তার মুখের তোরে একরকম ভেসে গেল দু’জনার মনের ইচ্ছা অনিচ্ছা।
বাপ রহিতাশ্ব মিন মিন করে বললে, “বৌমা যখন এত করে বুলছে তখন বুসায়ে দে একটো পাইখানা।”
এর আগে দু’দিন ধরা পড়েছে রামা। সারাদিন মুখ ঝামটা শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে গেছে। আশেপাশের প্রতিবেশীরা আসল ব্যাপারটা জানতে পেরে মুখ টিপে হেসেছে। বাপ রহিতাশ্ব রামাকে ঘরে ডেকে ফিসফিস করে জ্ঞান দিয়েছিল, “ ইচ্ছা তো আমারও করে, আমি যাই? জানিস তো তুর বৌটা কেমন। আমাদের আর ওই সুখের দিন নাই রে রামা। তাই উসব এখন ভুলে যা।”
বহুদিন যায়নি রামা। কিন্তু আজকের এই পরিবেশ পরিস্থিতি ও সুযোগ দেখে মনটা তড়বড়িয়ে উঠল যে! কিছুতেই বশ মানানো গেল না। যা আছে কপালে বলে বেরিয়ে পড়েছে। অভ্যাস জিনিসটা গাছের মতো। ওপরটা কাটলেও শিকড় থেকে যায়। মরে না, সুযোগ পেলেই আবার গজায়। হিমেল হাওয়া বইছে। পোশাক ভেদ করে সুঁচের মতো বিঁধছে। কিন্তু সেসব মালুম করছে না রামা। ওর মনে এখন অন্য ফূর্তি। কিছু কিছু আনন্দ বলে বোঝানো যায় না। বদ্যিদের জঙ্গল আর সামান্য দূরে। ভিতরে ঢুকতেই নজরে পড়ল জিনিসটা। খুবই আবছা। আরও খানিকটা এগিয়ে যাওয়ার পর চমকে উঠল। জেরিক্যান হাত থেকে পড়ে গেল। জল গড়াল মাটিতে। একটা লাশ ঝুলে আছে গাছের ডালে! হাওয়ায় দুলছে মৃদু। এমনিতে রামা যথেষ্ট সাহসী। তবুও শিউরে উঠল ভয়ে। যে কাজ করতে এসেছিল সেটা মাথায় উঠেছে।
একটু ধাতস্থ হয়ে ভীষণ অবাক হয়ে হল রামা। এভাবে কেউ মরে! সম্পূর্ণ উলঙ্গ এক মেয়েমানুষের লাশ। সুতো বলতে গলায় গেঁথে থাকা রশিটা। রামা অতি অল্প বিদ্যার খেটে খাওয়া মানুষ। বুদ্ধিশুদ্ধি নিতান্তই সোজাসাপ্টা। তবুও ওর মনে কতকগুলো জাগতিক প্রশ্ন জেগে উঠল। ইজ্জত নিয়ে কেউ গাছে ঝুলিয়ে রেখে যায়নি তো? কৌতূহলবশে কাছে গিয়ে লাশের মুখের দিকে তাকাল। আর একবার ভীষণ চমকালো। এ তো শান্তিবালার খুড়তুতো বোন মিনতি! মিনতি বিধবা। তিন বছরের এক মেয়েকে নিয়ে স্বামীর ভিটেতে থাকে। আপন বলতে শান্তিবালাই আছে। দুই বছর আগে স্বামী হারাধন ভোটের সময় গুলি খেয়ে মরল। মাথা মোটা, খুব পার্টি করার শখ ছিল। লাফিয়ে লাফিয়ে গিয়েছিল গোলমাল করতে। যাদের নির্দেশে গিয়েছিল তাদের নির্দেশেই ওকে মারা হয়েছিল। ভোটে জেতার জন্য তখন একটা বলির পাঁঠা দরকার ছিল। বিশ্বস্তসূত্রে এসব গোপন কথা পরে সবই জানতে পেরেছিল রামা। ভোটে জেতার পর কলকাতা থেকে বড় নেতা এসে মিনতির হাতে এক লাখ টাকা দিয়ে বলেছিল, তোমার স্বামীর বলিদান ব্যর্থ যাবে না। সেই সঙ্গে চাকরির আশ্বাস দিয়ে বলেছিল, পার্টির লোকাল নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলো, তোমার দায়িত্ব আমাদের। সরল সাদাসিধা মিনতি সে কথা বিশ্বাস করে তাদের কথা মতোই চলতো। সুযোগ বুঝে খেলা শুরু করে দিয়েছিল লোকাল নেতা সুখেন পোদ্দার ও তার সাঙ্গপাঙ্গ। ওদের সন্তুষ্ট করতে করতে কবে যে কেনা বাঁদিতে পরিণত হয়ে গিয়েছিল নিজেও জানে না। চোখ খুলেছিল অনেক পরে। একদিন রামার কাছে কেঁদে সব খুলে বলেছিল। এত কথা রামা জানতো না।
সত্যি কথা বলতে, সহ্য হয়নি রামার। একটা মেয়েকে বোকা বানিয়ে কয়েকটি নরখাদক লুটেপুটে খাবে, কেমন করে সহ্য হয়? ভীষণ রাগ হয়েছিল। কিন্তু একটু স্থির হয়ে ভেবে দেখেছিল, রাগ করে কাজ হবে না, বরং আরও খারাপ হবে। ঠান্ডা মাথায় মিনতিকে বলেছিল,“ দোষ তুমারও আছে মিনতি। তখুন তো আমার চে উরাই তোমার বেশি আপুন হয়েচিল। উ শালারা এক একটা বিষওয়ালা সাপ। উ শালারা দেবে চাকরি! এই জগ্গতে বিনা মাঙনায় কিছু দেওয়ার লুক খুব কম।”
অসহায়ভাবে মিনতি বলেছিল,“মরা ছাড়া আর আমার কোনও পথ খোলা নেই দাদা।”
রামা রেগে বলেছিল, “তুমি মরবা ক্যান? তোমার মেয়েটার কী হবে তাহলি? তুমি মরলে উরা তো আরু খুশি হবে। উ শালা সুখেন পোদ্দারকে প্যাচে ফেলতি হবে। সাহস আছে তুমার? এমুন বুদ্ধি করবো, শালাদের অত সহজে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। তুমাকে এত জ্বালান জ্বালালো, সব মুখ বুজে সহ্য করবা?”
মিনতির চোখে আগুন জ্বলে উঠেছিল,“কিন্তু আমি অসহায় মেয়েছেলে, ওদের সঙ্গে পারব কেমন করে?”
“আমি তুমার দাদার মতো। আমি আছি তুমার সাথে। যেমুন করে বলছি ঠিক অমুনটাই করতে হবে তুমাকে। মন দিয়া শুনো আমার কথা।”
রামা অবাক হয়ে গিয়েছিল নিজের বুদ্ধি দেখে। তার মগজের মধ্যে যে এতটা শয়তানি ঘিলু আছে, প্রথম আবিস্কার করেছিল। কেন যে অতটা উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল সেটা বুঝতেও সময় লেগেছিল কিছুটা। পরে নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করেছিল, মিনতির প্রতি কি তার কোনও গোপন দূর্বলতা আছে? ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি। কিন্তু তারপরে যে কাজগুলো করেছিল, সেগুলো অন্য কারও জন্য করা অত সহজ ছিল না। তবুও করেছিল রামা। কেন কে জানে!
ভাগ্নে কানাইয়ের সঙ্গে নিশিগঞ্জে গিয়ে যোগাযোগ করেছিল পরের দিনই। কানাইয়ের মোবাইল রিপেয়ারিং-র কাজ করে। ওর কাছ থেকে একটা সস্তায় একটা স্মার্ট মোবাইল নিয়ে ছবি তোলা ও ভিডিও করা শিখে নিয়েছিল যত্ন করে। নিজের সাধারণ মোবাইল রেখে ওটা দিয়েই কয়েকদিন প্রাকটিস করেছিল মন দিয়ে। তক্কে তক্কে ছিল, একদিন ধরে ফেলল সুখেন পোদ্দারকে। মিনতির ঘরে একেবারে মোক্ষম সময়ে ঢুকেই পটাপট কয়েকটি ছবি তুলে ফেলল। মুহুর্তের মধ্যে, সুখেন সামলে ওঠার আগেই একটা ছোট ভিডিও-ও করে ফেলল। অর্ধনগ্ন সুখেন বেশি চেঁচামেচিও করতে পারেনি।
কোনও রকমে কাপড় সামলে ফুঁসে উঠেছিল, “শালা তুই জানিস না কার ল্যাজে পা দিয়েছিস। তোকে শালা জ্যান্ত পুঁতে ফেলব। কয়েকদিনের মধ্যেই তুই মার্ডার হয়ে যাবি…।”
রামার মুখে ভয়ডরহীন হাসি, “গেরামের খেটে খাওয়া লুকদের আপনারা একটু বেশি বোকা ভাবেন। কিন্তু ঠকতে ঠকতে তারাও একদিন চালাক হতে বাধ্য হয়। সময় তো সবসময় পাল্টাচ্ছে দাদা। মিনতি সম্পর্কে আমার শালী। এতদিন উর সাথে এতকিছু করেছেন, উ গরিব বলে উর ইজ্জতের কুনও দাম নাই? ইসব ছবি আমি কাউকে দেখাবো না। তবে একটা শর্ত আছে। আপনি উকে মাসোহারা টাকা দেবেন। উর কাছে আর আসবেন না। রাজি না হলে আমি ইসব ছবি ভিডিও নন্দদুলাল দাসকে দিয়ে দিব। আপনার বিরোধী পক্ষ। যা করার উরাই করবে।”
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো শেষ করার পর এক বিস্ময়কর দৃষ্টিতে নিজেকে দেখার চেষ্টা করেছিল রামা। ওর মধ্যে এই মানুষটা এতদিন লুকিয়ে ছিল! সুখেনের চোখে তখন আগুন। হয়তো ঝাঁপিয়ে পড়ে রামাকে খুন করার ইচ্ছাই জেগেছিল মনে। কিন্তু রামার শক্তসমর্থ শরীরের দিকে তাকিয়ে আর সে সাহস হয়নি। আবার রাতারাতি মোবাইলটা হাতিয়ে নেওয়াও যে সম্ভব নয় সেটা বুঝতে পেরে চুপসে গিয়েছিল। কারণ তাতে লোক জানাজানির ভয়। দুয়ারে আর একটা ভোট। নীরবে মেনে নিয়েছিল রামার শর্ত। তবে রামা জানতো, সুযোগ পেলে ছোবল মারবেই। তাই যথাসম্ভব সাবধানে এবং সতর্ক হয়েই থাকত। কিন্তু ছোবলটা যে এরকম হবে তা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি! অজান্তেই কয়েক ফোঁটা জল বেরিয়ে এল চোখের কোণ বেয়ে।
দুই
তাড়াতাড়ি করে বাড়ি ফিরে এল রামা। ফেরার পর মনে হল, জেরিক্যানটা ওখানেই ফেলে এসেছে। আবার গিয়ে নিয়ে আসবে? কিন্তু মন সায় দিল না। কেউ দেখে ফেললে বিপদ হতে পারে। যদি খুন খারাপির কেস হয়, সন্দেহ ওর দিকেও আসতে পারে। উধোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানো কিছু মানুষের কাছে এখন জলভাত। ওরকম জেরিক্যান গ্রামের ঘরে ঘরে আছে। সুতরাং ওটা দিয়ে নাম জড়ানো সম্ভব নয়। ওটার মায়া করে আর লাভ কি, মেয়েটাই চলে গেল!
আচ্ছা, মিনতি কি সত্যি সত্যি খুন হয়েছে? একটু স্থির হয়ে বসে নিজেকেই প্রশ্ন করল রামা। এমনও তো হতে পারে, মিনতি আত্মহত্যাই করেছে। কিন্তু কেন? নিজের বাচ্চা মেয়েকে অসম্ভব ভালবাসতো, ওর কথা একবারও ভাবল না? নগ্ন হয়ে মরতে গেল কেন? মরে গেলে কেউ দেখলেও কিছু যায় আসে না, তবুও মৃত্যুর আগে কি লজ্জা চলে যায়? এখন ভালই চলছিল মিনতির। চালাক চতুরও হয়েছিল আগের চেয়ে। সেটাই কি তবে শেষপর্যন্ত কাল হল? সবকিছু কেমন তালগোল পাকিয়ে যেতে লাগল মাথার মধ্যে।
বাড়িতেই প্রাতঃকৃত্য সেরে অশান্ত মন নিয়েই দৈনন্দিন কাজকর্মে লেগে পড়ল রামা। শান্তিবালা এখনও ঘুমোচ্ছে। গোয়াল ঘরে ঢুকে গরুগুলোকে বের করে জাবনা দিল। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কুয়াশা কাটছে। বাপ উঠল একটু আগে। মা লক্ষ্মীমণি মারা যাওয়ার পর থেকে কেমন যেন মনমরা হয়ে থাকে। রামা বুঝতে পারে কষ্টটা। বেঁচে থাকতে গেলে একটা ঝগড়া করার লোকও প্রয়োজন। বুড়ো বয়সে সঙ্গীহারা হওয়াটা খুব একটা সুখকর ব্যাপার নয়। শান্তিবালা না থাকলে কি হবে, সেকথা ভাবলে এখনই বুক টনটন করে রামার। শান্তিবালার ওপরটা শক্ত হলেও ভিতরে নরম। দায়দায়িত্ব জ্ঞান খূব। বিয়ে হয়ে আসার পরেই রান্নাবান্নার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল। শ্বশুর শাশুড়িকে অবহেলা করেনি কোনওদিন। সংসারের সমস্ত কাজকর্ম করার সাথে সাথে বাবাকে যত্নআত্তি করে এখনও। যেন নিজের বাপ! শান্তিবালার কোলে মাথা রেখেই মরেছিল মা। মরার পরে অনেক কেঁদেছিল শান্তিবালা। তিন দিন ঠিকমতো মূখে কিছু তোলেনি। মেয়েমানুষের এই মায়াটুকু বড় অমূল্য, সংসার বেঁধে রাখে। তাই শান্তিবালার একটু গরম মাথা ও চালু মুখ দিয়ে কখনোই ওকে বিচার করে না রামা। বাপ রহিতাশ্বও, জানে রামা। সেও মনে মনে ভালবাসে, স্নেহ করে তার এই বৌমাটিকে।
কাজের মধ্যেও বিমর্ষ রামা। মন তার উচাটন। একটু পরেই আজ আবার কাঁদবে শান্তিবালা। এসব খবর তো চাপা থাকার নয়। মিনতি শান্তিবালার নিজের বোন না হলেও ভালবাসতো নিজের বোনের মতোই। বিয়ে দিয়েছিল নিজের হাতেই। সবসময় পাশে থাকার চেষ্টা করেছে। কিন্তু মিনতি যে স্বামী হারানোর পর ওদের চক্রান্তের শিকার সেটা জানে না। রামাও জানায়নি। কি জানাবে? হারামিগুলো গোপনে সরল মেয়েটাকে ফাঁদে ফেলেছে, সেটা জানিয়ে শান্তিবালার মন খারাপ করা ছাড়া তো কোনও লাভই হতো না। হঠাৎ রামার মনে হল, আত্মগ্লানি থেকে এসব করেনি তো মিনতি? ইচ্ছায় হোক অনিচ্ছায় হোক, পাপ তো পাপই থাকে। ওর মেয়েটা বড় হচ্ছে। ধীরে ধীরে বুঝতে শিখবে। জানবে সব। সেই ভয়েই কি মরল মিনতি?
হুড়মুড়িয়ে ঝড়ো হাওয়াটা ঢুকেই পড়ল একসময়। বয়ে আনলো পাশের বাড়ির মনোরঞ্জন,রামার খুড়তুতো ভাই। হাঁপাতে হাঁপাতে বললো, “খপরটা শুনিছো তুমরা? মিনতি, তুমার বোন বৌদি, ফাঁস লাগিয়ে মরেছে গো… বদ্যিদের জঙ্গুলে।”
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো শেষ করল মনোরঞ্জন। রামা তাকাল শান্তিবালার দিকে, বোঝার চেষ্টা করল ওর প্রতিক্রিয়া। শান্তিবালার চোখে অবিশ্বাস, মুখে আতঙ্ক। কোনও রকমে বলল, “ তুই নিজে দেখেছিস? উল্টো পাল্টা খবর দিয়ে আমাকে ঠকাতে চাস? মিনতি মরতে যাবে কোন দুঃখে শুনি?”
মনোরঞ্জন বলল, “না গো বৌদি, কুথাটা সত্যি। আমি নিজে দেখে এলাম তো একুনি। ও দৃশ্য দেখা যায় না গো। কে জানে মেয়েটা মরার আগে বস্ত্র ত্যাগ করেছিল ক্যান! লুকে লুকারন্য উখানে…।”
শান্তিবালা অসহায়ভাবে তাকাল রামার দিকে। সে দৃষ্টি বড় বেদনাদায়ক। রামা কিছুই বলছে না দেখে শান্তিবালা বলল, “ আমাকে ওখানে নিয়ে চলো। ওর যখন স্বামী মারা গেল তখনও মরার কথা ভাবে নাই। সেই মেয়ে হঠাৎ…”
শেষের কথাগুলো ঘোরের মধ্যে বলল শান্তিবালা। রামা দেখল, এখন আটকানোর চেষ্টা করলে হিতে বিপরীত হতে পারে। যতই মর্মান্তিক দৃশ্য হোক, ওর নিজের চোখে একবার দেখা দরকার। এক জীবনে মানুষকে কত কিছুই তো দেখতে হয়! সব কি আর সুন্দর দৃশ্য হয়?
মনোরঞ্জনের গলার আওয়াজ পেয়ে রহিতাশ্ব বেরিয়ে এসেছে ঘর থেকে। ঘটনা শুনে কিছুক্ষণ থম মেরে থেকে আবার ভিতরে ঢুকে গেল।
শান্তিবালা প্রায় ছুটতে ছুটতে চলেছে। কাপড় চোপড় আলুথালু। পিছন পিছন রামা। ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখল, পুরো গ্রাম ঝাঁপিয়ে পড়েছে সেখানে। নিস্তরঙ্গ জীবনে বড়সড় তরঙ্গ! তার ওপর যুবতী মেয়ের উলঙ্গ লাশ। মুখে জ্ঞানের বুলি আওড়ালেও বেশিরভাগ পুরুষের দৃষ্টি লাশের ওপর নিবদ্ধ। এভাবে খোলা ময়দানে উলঙ্গ নারী শরীর দেখার সুযোগ কি বারবার পাওয়া যাবে? হোক সে মৃত, দ্রষ্টা তো জীবিত!
শান্তিবালা ভিড় ঠেলে সামনে গিয়ে ঝুলন্ত মিনতিকে দেখেই অজ্ঞান হয়ে গেল। পাড়া প্রতিবেশী মহিলারা ওর শুশ্রূষা করতে এগিয়ে এল। রামা নীরব দর্শক। পুলিশ এসেছে, এবার লাশ নামানো হবে। রামা আর অপেক্ষা করতে পারছিল না। যত তাড়াতাড়ি লাশ নিয়ে যায় ততই মঙ্গল। হাজার হাজার লোলুপ দৃষ্টি মৃত মেয়েটাকেও গিলে গিলে খাচ্ছে। একটা ধর্ষিতা মেয়েকে আর কত ধর্ষণ করবে শালারা? মৃত শরীরটা নামিয়ে দিলে সেটাও বোধহয় ছাড়বে না!
সুখেন পোদ্দার ও তার দলবল তদারকি করছে। ওরাই গ্রামের হর্তাকর্তা, ওদের কথাতেই সব হয়। থানার বড়বাবু ওদের কথা মতোই কাজ করছেন। আইন আর রাজনীতি মিলেমিশে একাকার। লাশ নামিয়ে সাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়ার পর কিছুটা স্বস্তি পেল রামা। বড়বাবু খাতা খুলে কি কি সব লিখলেন। ফটফট করে ছবি তুলল একজন।
বড়বাবু জোরে জোরে বললেন,“লাশ পোস্টমর্টেম করতে পাঠানো হবে। আপনারা জায়গাটা ক্লিয়ার করুন। পোস্টমর্টেম হয়ে গেলে বডি হ্যান্ড ওভার করে দেওয়া হবে। ওর আত্মীয়স্বজন কারা আছেন এগিয়ে আসুন।”
এগিয়ে গেল রামা। শান্তিবালার জ্ঞান ফিরেছে, এখন অঝোরে কাঁদছে।
বড়বাবু খাতায় চোখ রেখেই বললেন,“আপনার নাম?”
“রামানন্দ দাস।”
“মেয়েটি আপনার কে হয়?”
“আমার শালী।”
“আপনার স্ত্রীর বোন। আপনার স্ত্রী কোথায়?”
রামা আঙুল দিয়ে ক্রন্দনরত শান্তিবালাকে দেখাল। বড়বাবু সেদিকে তাকিয়ে বললেন,“আপনাদের সই লাগবে। আপনি একটু ম্যানেজ করুন। নইলে লাশ পেতে অসুবিধা হবে। আঙুলের ছাপ হলেও চলবে।”
রামা ম্যানেজ করল। খাতাটা দারোগাবাবুর হাতে দিতে দিতে বলল, “একটা কথা বলতেম ছার। এটা কি সত্যি সত্যি আত্মহত্যা? উলঙ্গ হয়ে কেউ আত্মহত্যা করে?”
দারোগাবাবু বাঁকা চোখে তাকালেন একবার। তারপর হেসে বললেন, “আপনার কি খুন বলে সন্দেহ আছে? যদি থাকে তাহলে লিখিত জানান। প্রোপার তদন্ত হবে। আমার কিন্তু সেরকম কিছু মনে হচ্ছে না। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এলেই সব পরিস্কার হয়ে যাবে। এক দুই দিন অপেক্ষা করতেই হবে। বুঝতেই পারছেন এসব কাজ সঙ্গে সঙ্গে হয় না।”
তিন
দেখতে দেখতে বেশ কয়েকদিন পার হয়ে গেছে। মিনতির আত্মার শান্তি কামনায় শান্তিবালা বামুন ডেকে যতটা সম্ভব পারলৌকিক ক্রিয়াকর্ম সম্পন্ন করেছে। স্বামীর কাছে আবদার করে রেখেছে, সুযোগ পেলে একবার গয়ায় নিয়ে গিয়ে পিন্ড দান করিয়ে আনতে হবে। এভাবে মরল মেয়েটা! পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পাওয়ার পরেই বড়বাবু রামাকে ডেকেছিলেন। পরিস্কার বলে দিয়েছেন, মিনতি স্বেচ্ছায় আত্মহত্যা করেছে, জোর করে মেরে ঝুলিয়ে দেওয়ার কোনও প্রমাণ ওই রিপোর্টে নেই। সেই সঙ্গে তিনি এটাও বলেছেন, নগ্ন হয়ে ফাঁস নেওয়ার কারণটা তিনিও বুঝতে পারেননি। অনুমান করেছেন, মরার আগে নাকি মানুষের অনেক রকম বিকার হয়, এটা হয়তো সেরকমই কিছু।
মিনতির মেয়ের দায়িত্ব শান্তিবালা নিয়েছে। রামা আপত্তি করেনি। ওদের ছেলের সাথেই মানুষ হবে। তাছাড়া ওর দায়িত্ব নেওয়ার তো আর কেউ নেই। মেয়েটি ভারি মিষ্টি ও শান্তশিষ্ট স্বভাবের। মায়ের মৃত্যু ওর ভিতরটা দুমড়ে মুচড়ে দিয়েছে, মুখ দেখলেই বোঝা যায়। মায়ের ঝুলন্ত লাশ ওকে দেখতে দেওয়া হয়নি। পোড়ানোর আগে শেষবারের মতো মুখটা দেখেছিল শুধু। কাঁদেনি। অবাক চোখে তাকিয়ে দেখেছিল শুধু। জন্ম মৃত্যুর খেলা বোঝার মতো বয়স ওর হয়নি। কিন্তু মা যে আর ফিরে আসবে না সেটা বুঝেছিল। শিশুরা অবুঝ হলেও, এমন অনেক কিছুই বোঝে, যা হয়তো বড়দের বোধশক্তিতে ধরা পড়ে না। ছোট্ট লতাকে নিয়ে একদিন বেরিয়েছিল রামা। পথে সুখেন পোদ্দারের সাগরেদ শিবেনকে দেখেছিল দূর থেকে। দেখেই আঁতকে উঠেছিল। রামার নজর এড়ায়নি সেটা। কিন্তু কেন? প্রশ্নটা জাঁকিয়ে বসে আছে রামার মনে।
এক রাতে নবীগঞ্জের হাট থেকে ব্যবসার কাজ সেরে বাড়ি ফিরছিল রামা। রাত খুব বেশি না হলেও অমাবস্যার অন্ধকার গ্রাস করে রেখেছিল সব আলো। গ্রামে ঢোকার মুখেই অন্ধকার ফুঁড়ে বেরিয়ে এল কয়েটি জোনাকির মতো মোবাইল আলো। পথ আগলে দাঁড়াল ওরা। সুখেন পোদ্দার সামনে এসে বলল,“ সেবারে খুব ফাঁদে ফেলেছিলি রে রামা। কয়েকটা ছবি তুলে আমাকে বোকা বানিয়ে রেখেছিলি। আমি খারাপ ভাবে নিইনি ব্যাপারটা। সুযোগের সদ্ব্যবহার করাটাই রাজনীতি। সেদিন তোর দিন ছিল। সত্যি করে একটা কথা বলবি, তুই কোনও দিন মিনতির ঘরে যাসনি?”
কথাটা বলেই ফিকফিক করে হেসে উঠল সুখেন। সঙ্গে বাকিরাও। গর্জে উঠল রামা,“ শালা… আজেবাজে কথা বললি মুখ ভেঙে দিব। মিনতি আমার ছোট বুনের মতো ছিল। তুরা নিজেরা যেমুন সব্বাইকে তেমুনটাই ভাবিস।”
“চোপ শালা।” রামার গালে সজোরে একটা চড় মারল সুখেন, “বেশি সতীপনা দেখাবি না। তুই শালা আমার ইজ্জত নষ্ট করেছিস। পুরুষমানুষেরও ইজ্জত থাকে। তোর ওপর আমার খুব রাগ আছে। নেহাত জনপ্রতিনিধি বলে কিছু করতে পারি না। সেরকম সুযোগ পেলে কি করব স্বপ্নেও ভাবতে পারবি না।”
সুখেন সিগারেট ধরাল। আগে বিড়ি জুটতো না, এখন দামি সিগারেট ছাড়া মুখে তোলে না। এখন ওর সুসময়! গ্রামের সেরা বাড়িটা ওর। ঝা চকচকে, ছোটখাট রাজপ্রাসাদ। শহরেও আছে। একসময় খুব কষ্ট করেছে। মিত্তিরদের ট্রাকের খালাসি ছিল। রাজনীতি জিনিসটা ম্যাজিকের চেয়ে কোনও অংশে কম নয়। ভোজবাজির মতো জীবন পাল্টে দিতে পারে!
এবার শান্ত গলায় সুখেন বলল,“ শোন রামা, তোর সাথে আমার রাজনৈতিক কোনও বিরোধ নেই। শত্রুতাও নেই। একটা ঘটনা ঘটেছিল, মিটে গেছে। তোর কথা মতো আমি টাকা দিয়েছি। ও কেন মরল, আমি জানি না। মরে গেছে, আর তো কিছু করার নেই। তুই যে কখনও খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে মিনতির ঘরে যাসনি, আমি জানি। একটু বাজিয়ে দেখলাম তোকে। এবার আসল কথায় আসি। সবার সামনে সেটা বলা ঠিক হবে না বলে এভাবে তোর পথ আটকেছি।”
রামা থমকাল। নতুন ষড়যন্ত্রের গন্ধ পেল। কিছু লোকের কাছে কখনোই ভাল কিছু আশা করা যায় না। সুখেন তেমনই একজন। রামা সুখেনের কথা শোনার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।
“মিনতির স্বামী আমাদের লোক ছিল। মিনতিও। তোরা ভুল ভাবিস, মিনতির কাজের জন্য আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু আমরা ছোটখাট নেতা, আমাদের কথা হাইকমান্ড থোরাই কেয়ার করে। অন্য ভোট এসে যাওয়াতে হাইকমান্ড পরিস্কার বলেছিল, ওর চাকরির ব্যবস্থা পরে হবে, এখন রফিক ইস্যু নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ো। পার্টি গাইডলাইন না মানলে চলবে কেন? এই হচ্ছে আসল সত্য।”
থামল সুখেন। আর একটা সিগারেট ধরাল। রামার কপালে চিন্তার ভাঁজ দেখা দিল। শালা, এতবড় গৌরচন্দ্রিকা করছে কেন? নিশ্চয়ই বড় কোনও ঘাপলা আছে।
“শম্ভু, মানে মিনতির বর এবং মিনতির নাম যেন গ্রামবাসী চিরকাল মনে রাখে তার জন্য আমাদের কিছু একটা করা দরকার। লোকাল কমিটি বসে মোটামুটি একটা ডিসিশন নিয়েছি বুঝলি। মিনতির বাড়িতে আমরা একটা পার্টি অফিস বানাব। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে স্মৃতিসৌধ-টৌধ বসবে। এতে ওপর থেকে ওদের আত্মা নিশ্চয়ই খুশি হবে। তুই কি বলিস? ডিসিশনটা ভাল না?”
রামা বাঁধা দিয়ে বলল, “অসম্ভব। ওই জমি, ঘরবাড়ির উপর মিনতির মেয়ের অধিকার… এ হতে দিব না আমি।”
“জানতাম তুই এমন করেই বলবি। তাই তো এখানে ধরা। ওর জমি ওরই থাকবে, বড় হলে বুঝিয়ে দেব আমরা। তুই ভাল করেই জানিস, এই এলাকায় আইন আমার কথাতেই চলে। বেশি গির্জিয়ানগিরি করলে গাঁজার কেসে ফাঁসিয়ে দেব, তোর পরিবারও রাস্তায় এসে দাঁড়াবে। তুই চাইলে কিছু ক্যাশ টাকাও পেয়ে যাবি, তোর ব্যবসার কাজে লাগবে। ভাল করে ভেবে বল কোনটা তুই চাস?”
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শিবেন বলল, “দাদার প্রস্তাবটা কিন্তু খুব ভাল রামাদা। অযথা বাওয়াল খাড়া করে হিরো সাজতে গেলি ওটুকুও জুটবে না। তুমি বিবিবাচ্চাওয়ালা মানুষ, একটা বাচ্চা মেয়ের জন্য কেন শুধু শুধু এসব ঝামেলায় জড়াবে?”
পাশের আর একজন শিবেনের হাতের অস্ত্রটার ওপর আলো ফেললো। ছ্যাঁৎ করে উঠল রামার বুকের ভিতরটা। পৃথিবী বদলায়, সময় বদলায়, কিন্তু কিছু মানুষ কিছুতেই তার আদিম রূপ থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না কেন!
চার
রামা অসহায়। আইনের দরজা সবার জন্য নয়। তাছাড়া এইরকম প্রত্যন্ত অঞ্চলে আইন পৌঁছায় না। সুখেনের মতো লোকেরাই আইন-প্রশাসন সবকিছু। ওদের অঙ্গুলিহেলনেই চলে। এক সুখেন যায় আর এক সুখেন আসে, এভাবেই চলে। দূর্বলের ওপর শোষণ ও অত্যাচার এই পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাভাবিক ঘটনা। তার মধ্যেও নিজের অস্তিত্বের শিকড় আকড়ে ধরে কেউ কেউ বেঁচে থাকার চেষ্টা করে। প্রতিবাদ করার চেষ্টা করে। রামা তেমনই একজন। অন্যায়ের সঙ্গে হাত মেলাবে না জীবন থাকতে।
মরিয়াভাবে বলল,“ আমার কুনও টাকা লাগবি না। পাপের টাকা আমি নিব ক্যান? ভগবান দুটা হাত পা দিয়েছে, করে কিম্মে যা পাই তাই খাই। কাউকে ঠকায়ে কুনও কিছু পাওয়ার আশা আমি করি না।”
ব্যস, এইমুহুর্তে এই কথাটুকুনই রামার প্রতিবাদ। তাতেই একটু হলেও শান্তি পেল। যদিও ওরা এই কথায় হো হো করে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। গায়ে মাখল না রামা।
শিবেন হাসতে হাসতে বলল,“ আমরা ভুলেই গেছিলাম, তুমি তো আবার সতী কমিটির চেয়ারম্যান! কি করব দাদা, আমরা তোমার মতো গুড বয় হতে পারলাম না, আফসোস।”
রামা আর দেরি করল না। ওদের কথা শোনা শেষ, সোজা বাড়ির দিকে হাঁটা দিল। পিছন থেকে ওদের কথা ভাসছে তখনও,“শালা নীতিজ্ঞান শেখায়! দু’দিন আগেও বনবাদাড়ে হেগে তাল পেত না…কথা না শুনলে গুঁজে দেব ওদিকেই…”
এই ঘটনার দু’দিন যেতে না যেতেই সুখেনরা মিনতির ভিটেতে পার্টি অফিস তৈরির কাজ শুরু করে দিল। মৃদু গুঞ্জন উঠলেও সামনে বলবে, এমন সাধ্য কার? দু’চারজন রামাকে এসে বলল,“ ওই জমি তো মিনতির। এখন ওর মেয়ের। তুমি কিছু বলবে না?”
“বলতে পারি। আপনারা পাশে থাকবেন তো? আমার কথা ওরা পাত্তা দেবে না। আপনারা ভাল করেই জানেন সেটা।”
রামার এই আবদার শুনে ওরা আর দ্বিতীয়বার প্রতিবাদের কথা বলতে আসেনি। আগুন উসকে দেওয়া সহজ, নিজে আগুন হওয়া কঠিন। আগুনের কথা মনে আসতেই হঠাৎ একটা উদ্ভট চিন্তা মাথায় উঠে এল রামার। অন্যমনস্কভাবে জোরে জোর মাথা নেড়ে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,“ আমিও শালা এক পাগলা, আগুন হওয়া কি মানুষের কম্ম!
তারপর কেটে গেছে অনেকদিন। এক শীত পেড়িয়ে আর এক শীত এসেছে। আজ মিনতির মৃত্যুবার্ষিকী। কেউ মনে না রাখলেও শান্তিবালা মনে রেখেছে। কিছু তাজা ফুল এনে দিয়েছে মিনতির ছবির সামনে। রামার মনে থাকলেও, ওই স্মৃতি আর রোমান্থন করার ইচ্ছে নেই। মিনতির মেয়েটা একটু বড় হয়েছে, ধীরে ধীরে মিশে গিয়েছে ওদের পরিবারের সঙ্গে। ইস্কুল যায়, পড়াশোনা করে, খেলাধুলা করে, সবকিছু স্বাভাবিক। কিন্তু সত্যিই কি তাই? অস্বাভাবিকের কোনও আলাদা অবয়ব থাকে না। সে স্বাভাবিকের মধ্যেই মিশে থাকে। যেমন মানুষের মধ্যেই খুনি মানুষ মিশে থাকে, তাদের আলাদা করে কি চেনা যায়? এই যে রামা এক বছর ধরে অস্বাভাবিক একটা মানুষে পরিণত হয়েছে, তা কি বাইরের মানুষ বুঝতে পারছে? রামার মধ্যে আর একটা রামা এসে বাসা বেঁধেছে। তার সঙ্গে কঠিন লড়াই করেও তাড়াতে পারেনি। এই রামা এখন ওই রামার দাস। তার নির্দেশ মেনেই চলে। বুঝতে পারছে, এই দাসত্বের পরিণাম মারাত্মক কিছু হতে চলেছে। তবুও যেন তার কিছুই করার নেই। এ যে কি সংকট, তা কাউকে বলারও উপায় নেই। এমনকি শান্তিবালাকেও বলতে পারেনি।
আজ সকাল থেকেই অন্য রামা অতি সক্রিয়। সারাদিন ধরে সে অস্থিরতার আঁচ অনুভব করল রামাও। দর্শকদের মতো কয়েকদিন ধরেই রামা দেখে যাচ্ছে তার কীর্তিকলাপ। প্রচন্ড শীত উপেক্ষা করে সে কয়েক রাত ধরে দূর থেকে নজরদারি করছে ওদের ওপর। মিনতির বাড়ির ওপর। সন্ধ্যার দিকে অনেক লোক আসে পার্টি অফিসে। মিটিং হয়, গল্প গুজব হয়, টিভি চলে। একটু রাত বাড়লে বেশিরভাগ চলে যায়। তখন থাকে সুখেন পোদ্দার ও তার খাস লোকজন। ওরা দরজা বন্ধ করে মদ খায়। মাঝে মধ্যে মেয়েমানুষ এনে ঢোকায়। অনেক রাত পর্যন্ত চলে মৌজমস্তি।
রামা বুঝতে পারছে না, তার ভিতরের অন্য রামা কি চায়? কিন্তু এটুকু অনুমান করতে পারছে আজ রাতে ভয়ঙ্কর কিছু একটা ঘটতে চলেছে। রামাও যেন প্রস্তুত। দ্বৈত সত্ত্বা হলেও তাদের ইচ্ছা কি একই? নইলে পেট্রোল ভর্তি জেরিক্যান দুটো সঙ্গে করে আনবে কেন সে? আজ অমাবস্যা। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। কনকনে শীত। মঙ্গলপুর এইমুহুর্তে জনমানবহীন শ্মশানপুরী যেন। তার ওপর মিনতির বাড়িটা মূল বসতি থেকে একটু ফাঁকা জায়গায়।
রাত বাড়তেই পার্টি অফিস ফাঁকা। দরজায় খিল পড়তেই রামা বুঝল, এবার ওদের আসর বসতে চলেছে। আজ কোনও মেয়ে টেয়ে নেই। একদিক থেকে ভালই হয়েছে। অপেক্ষা করতে লাগল রামা। আধাঘন্টা পর জেরিক্যান দুটো নিয়ে অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এল। কান পাতল পার্টি অফিসের দরজায়। আওয়াজ নেই, তার মানে ভিতরে সব কটাই নেশায় বুদ। নিঃশব্দে বাইরে থেকে শিকল তুলে দিল ঘরের। তারপর ঘুরে ঘুরে ঘরের চারপাশে ছিটিয়ে দিল জেরিক্যান করে আনা পেট্রোল। কটু গন্ধে ভরে গেল বাতাস। যদিও ভিতরের কয়েকজন নেশার ঘোরে কিছুই টের পেল না। প্রাথমিক কাজ সেরে রামা একটা বিড়ি ধরাল। শেষ সুখটান দিয়ে সেটা ছুঁড়ে দিল দরজার গায়ে। অগ্নিশলাকা থেকে পেট্রোলসিক্ত দরজা টেনে নিল উত্তাপ। জ্বলে উঠল, মুহুর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল আগুন।
রামা লোকজন আসার আগেই জেরিক্যান দুটো হাতে নিয়ে উল্টোদিকের বাঁশঝাড়ের মধ্যে দিয়ে হাঁটা শুরু করল। একটু পরেই পৌঁছে গেল বদ্যিদের জঙ্গলে, যেখানে মিনতি ফাঁসি দিয়েছিল। আগেই একটা গর্ত করে রেখে গিয়েছিল মিনতির ঝুলন্ত লাশটার ঠিক নীচে। ঝটপট জেরিক্যান দুটো সেই গর্তে পুরে মাটি চাপা দিয়ে দিল। এবার জঙ্গলের শর্টকাট রাস্তা ধরে কয়েক মিনিটের মধ্যেই বাড়ি পৌঁছে গেল। যেতে যেতেই শুনতে পেল বহু মানুষের কোলাহল। দেখতে পেল লাল হয়ে ওঠা আকাশ। আগুন সবসময় উদ্ধর্মুখী, তাই বোধহয় দেহ পুড়িয়ে দেয় কেউ কেউ। আগুন পৌঁছে দেয় তাকে অনন্তলোকে।
রামাকে দেখে শান্তিবালা উদ্বিগ্ন মুখে বলল, “শুনলাম ওদিকে কোথায় যেন আগুন লেগেছে। সবাই ছুটে যাচ্ছে। কার বাড়িতে আগুন লেগেছে?”
রামা শান্ত গলায় বলল,“ আমিও শুনলাম। পূব পাড়ার উদিকে, মিনতির বাড়ির আশেপাশে কুথাও হবে। চিন্তা নাই, মনোরঞ্জন ঠিক দেখতি গেছে। ও এলে সব খবর পেয়ে যাবে। আচ্ছা, গতবছর এই দিনেই মিনতি মরেছিল না?”
শান্তিবালা একটু অবাক হল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,“হ্যাঁ।”
প্রশ্নটা রামা করেনি, অন্য রামা করেছিল। শান্তিবালার উত্তর শুনে সে বেরিয়ে গেল। স্পষ্ট অনুভব করতে পারল রামা। আর তক্ষুনি দ্বিগুণ ঠান্ডা ঝাঁপিয়ে ধরল ওর শরীরে। কাঁপতে কাঁপতে ঘরে গিয়ে লেপের তলায় ঢুকে পড়ল। শান্তিবালা ঘরে ঢুকে জিজ্ঞাসা করল,“ কি গো ভাত খাবেনা?”
লেপের তলা থেকেই রামা ক্ষীণকন্ঠে বলল,“না। কেমন জানি জ্বর জ্বর লাগছে। তুমি খেয়ে নাও।”
XXXXX
দিনহাটা, কোচবিহার।
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!