ঈদ, অনিশ্চয়তা আর আদিব

লেখক: হুসাইন দিলাওয়ার
প্রকাশিত হয়েছে : মার্চ ১, ২০২৬ | দেখা হয়েছে: ২৬০ বার

ন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। আদিব জানালার পাশে বসে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে। নিচে কোথাও ইফতার বিক্রির হাঁক, সদ্য ভাজা জিলাপির গন্ধ, হৈ হল্লা, সবই আছে, শুধু তাদের মেসটায় কেউ নেই। চার হাজার টাকা টেবিলের কোণে রাখা, যেন আদিবের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করছে - এই টাকায় কতদূর যাওয়া যায়?
মা বিকেলে ফোন করেছিল।
‘কিরে বাবা, ইফতারের কিছু জোগাড় করেছিস তো?’
আদিব বলেছিল,
‘হ্যাঁ মা, হয়ে যাবে।’
কিন্তু ফোন রাখার পর বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। ‘হয়ে যাবে’ এই শব্দদুটো এখন তার কাছে বড় মিথ্যে মনে হয়।
গ্রামের কথা মনে পড়ে। তেঁতুলগাছের ছায়া, বিকেলের বাতাস, ইফতারের প্রস্তুতি। এখানে আদিব একা। একটা শহর, কয়েকটা স্বপ্ন, আর অসংখ্য হিসাব।
আশা করেছিল টিউশনি থেকে কিছু অতিরিক্ত টাকা বোনাস হিসেবে পাবে। এক হাজার টাকার চারটি নোট গুণে গুণে আবার রেখে দেয়। একে একে সবাই বাড়ি চলে গেছে। হৈ-হুল্লোড় করতে করতে ব্যাগ-বোঁচকা গুছিয়ে মহা খুশিতে ঈদ উদযাপনের জন্য চলে গেছে সবাই। সবার শেষে গিয়েছে শ্রাবণ। সে যাওয়ার সময় আদিবকে জিজ্ঞেস করেছিল:
‘তুই কবে বাড়ি যাচ্ছিস রে?’
‘টিউশনিটা থেকে ছাড়ছে না রে, বলছে আর কয়েকটা দিন পড়িয়ে দিতে।‘
কিন্তু বোনাস তো পায়নি, উপরন্তু টিকিট না পাওয়ার আশঙ্কায় মনটা দুমড়ে-মুচড়ে যায় তার। ট্রেনের সাতশো টাকার টিকিটও এখন দুই হাজার টাকা। একটু কমে পাওয়ার কোনো উপায় নেই। বাসের টিকিট যেন পূর্ণিমার চাঁদ দেখা যায়, ধরা যায় না। এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে মাগরিবের আজান হয়ে যায়, আদিব টেরই পায় না।
ভেতরটা কেমন এলোমেলো হয়ে থাকে তার। অগত্যা হন্তদন্ত হয়ে ইফতার তৈরি করে। তার বিক্ষিপ্ত মনে নতুন দুশ্চিন্তা দানা বাঁধে—টিউশন ফি! ঈদের পরেই মোটা অঙ্কের টাকা পরিশোধ করতে হবে।
সময়মতো সেমিস্টারের টিউশন ফি’র টাকা পরিশোধ করতে পারবে কি না এই দুশ্চিন্তাটা বারবার এসে হানা দেয় তার ক্লান্ত মস্তিষ্কে। ক্ষুধাতুর পেটেও ছোলামুড়ির গ্রাসটুকু গিলতে কষ্ট হয় তার। গলা দিয়ে নামতে চায় না। ক্ষুধার চেয়ে দুশ্চিন্তাই যেন বেশি।
ভালো রেজাল্টের কারণে হয়তো কিছু ছাড় পাবে, কিন্তু তারপরেও টাকার অঙ্কটা মোটেও কম নয়। এই হিসাব মাথার ভেতর ঘুরপাক খায়।
এদিকে গ্রামের দিকেও স্বস্তির খবর নেই। কৃষির যা অবস্থা, ধানের দাম নেই বললেই চলে। যে সামান্য দাম পাওয়া যায় তা কীটনাশক, কামলা আর নিত্যনির্বাহের খরচ মেটাতে মেটাতেই শেষ হয়ে যায়। সব হিসাব কাটছাঁট করে শেষে অবশিষ্ট থাকে হাতে গোণা  কিছু টাকা।
এমন অবস্থায় পাঁচ-ছয় হাজার টাকা খরচ করে গ্রামের বাড়িতে ঈদ করতে যাওয়া আদিবের জন্য একপ্রকার বিলাসিতা। অথচ তার মনটা বারবার গ্রামেই ছুটে যাচ্ছে। খুকির সঙ্গে খুনসুটি, উঠোনে রাঙা দুপুর, ঈদের নতুন জামা, বাবার সঙ্গে ঈদের জামাতে যাওয়া, মায়ের হাতের সেমাই। সবকিছু চোখের সামনে ভেসে ওঠে। স্মৃতিগুলো ভর করে তার চোখে, ঝাপসা হয়ে ওঠে দৃষ্টি।
নামাজ শেষে সে সোহাগ মামার দোকানে যায়। এক কাপ চায়ের অর্ডার দেয়।  কাচের কাপের ভেতর ধোঁয়া ওঠা লালচে চা। দুটো চুমুকেই শরীরটা একটু হালকা হয়। কিন্তু মনটা এখনো ঈদে বাড়ি ফেরা হবে কি না এই অনিশ্চয়তায় দোল খায়।
এই সময় কেউ একজন পিছন থেকে তার পিঠে হাত রাখে।
আদিব ঘুরে তাকিয়ে দেখে সৃজন ভাই। এলাকার বড় ভাই হিসেবেই পরিচিত। একসময় ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, এখন একটি প্রাইভেট ব্যাংকের বড় কর্মকর্তা। গত বছর স্কুলের এক অনুষ্ঠানে পরিচয় হয়েছিল তাদের।
‘কী রে, তুই বাড়ি যাসনি?’
‘টিকিট পাওয়া যাচ্ছে না, ভাইজান।‘
‘কী বলিস? তাহলে তো ভালোই হলো।‘
‘ভালো হলো কেমনে, ভাইজান?’
সৃজন ভাই হেসে বলেঃ আরে আমি বাড়ি যাওয়ার সময় একজন সঙ্গী খুঁজছিলাম। তোর ভাবী আর ভাতিজা-ভাতিজিদের আগেই গ্রামে পাঠিয়ে দিয়েছি। আমি অফিসের কাজে আটকা পড়েছিলাম। ড্রাইভারও তো আমাদের গ্রামের। তাকেও যেতে হবে। একা ড্রাইভারের  সাথে যাওয়া ক্লান্তিকর হত। তুই চল আমার সঙ্গে। গল্প করতে করতে যাওয়া যাবে।
একটু থেমে সে আবার বলেঃ-
আর শোন, ঈদের পরে আমাদের বিপি স্কুলের প্রাক্তন ছাত্রদের নিয়ে কোনো প্রোগ্রাম করা যায় কি না ভেবে দেখ। ঠিক আছে? তাহলে কাল আমরা একসাথেই রওনা দিচ্ছি।
এই কথাগুলো বলে হঁনহঁন করে চোখের সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে গেলো সৃজন ভাই।
আদিব চেয়ারে বসে পড়ে। কিছুক্ষণ আগেও যে অনিশ্চয়তা বুকের ওপর পাথরের মতো চেপে ছিল, মুহূর্তেই তা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। 
 সত্যি সত্যিই ঈদে বাড়ি যাওয়া হচ্ছে! এই ভাবনাতে মুখে অনিচ্ছাকৃত একটা হাসি ফুটে ওঠে আদিবের।

ঢাকা, বাংলাদেশ

শেয়ার করুন:
মন্তব্যসমূহ (0)

এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। যেসব ঘর পূরণ করা বাধ্যতামূলক, সেগুলোতে * চিহ্ন দেওয়া আছে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন