বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬, ফলাফল এবং কিছু কথা
বিভিন্ন মিডিয়া থেকে প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী মনে হচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ( বিএনপি) এবং জোট একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আবারও সংসদে যাচ্ছে। ক্ষমতাসীন পার্টির তকমা নিয়ে সংসদে যাওয়া তাদের জন্যে এই-ই প্রথম নয়। তবে দলের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে তারেক জিয়ার জন্যে এটা এবারই প্রথম। শুভকামনা রইলো তার জন্যে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ঘটে যাওয়া ছাত্রজনতার অভাবিত বিক্ষোভের মুখে আওয়ামীলীগ সরকারের পতনের পরে বলা যায় দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আসে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং তাদের অধীনেই প্রায় ষোলো মাস পরে অনুষ্ঠিত হয় এই নির্বাচন। অনেক জল্পনা-কল্পনা এবং শঙ্কার পরে নির্বাচনের ফলাফলে আমার দৃষ্টিতে যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রতিফলিত হয়েছে তাকে নিম্নরূপে তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।
১. ১৯৭১ এর মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরুদ্ধ শক্তিকে (জামায়াতে ইসলামী) বাংলাদেশের অধিকাংশ জনগণ এখনো অন্তরে ততটা জায়গা দেয় নাই। অন্তত যতটা ধারণা করা হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে এই জোটটির নির্বাচনী এজেন্ডার প্রধান বিষয়টিই ছিল এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে স্বাধীনতাকে স্বীকার করা আর না করার একটি দোদুল্যমানতা। সেই সময়কালীন নিজেদের অপরাধগুলোকে কোনো না কোনোভাবে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা এবং এটি করতে গিয়ে অবান্তর কিছু কথাবার্তা বলা। এদের আরেকটি বিষয় ছিল নারীদের ঘরবন্দী করে রাখার ফতোয়াগুলোকে জনমনে সিদ্ধ করে তোলা! অর্থাৎ দেশটিকে অবধারিত ভাবে পশ্চাৎ দিকে ধাবিত করা। না, জনগণ তা তেমনটা গলাধঃকরণ করেননি। না, জনগন তাদেরকে জান্নাতের টিকিটের সোল এজেন্ট (Sole Agent) হিসেবেও বিশ্বাস করেননি। এই ফলাফলে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয় প্রমাণিত হ'লো সেটি হচ্ছে, ধর্মীয় গোঁড়ামির দিক থেকে এই দেশের মানুষ এখনো তার পার্শ্ববর্তী দেশের মানুষের চেয়ে অনেক বেশি মুক্তমনা এবং উদার আছেন!
২. বাংলাদেশের রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক চর্চা এখনো যে সামন্ততান্ত্রিক খাঁচার মধ্যে বন্দী হয়ে আছে তা আবারও প্রমাণিত হ'লো!
৩. দেশটির সবচেয়ে পুরনো এবং তৃনমূল পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি শিকড়ে বিস্তৃত দলটির নাম এখনো সম্ভবতঃ আওয়ামীলীগ। এটা খুবই দুঃখ জনক যে এবারের নির্বাচনে এই দলটি অংশগ্রহণই করতে পারলো না! কিন্তু কেন? এর উত্তরে হাজার পাতা লিখলেও হয়তো সব কারণগুলো তুলে ধরা সম্ভব হবে না! তাই দল অন্ধ, স্বার্থান্ধ এবং যারা পারিবারিক পরম্পরা বা আদর্শগত কিংবা অন্য যে কোনো কারণেই আওয়ামীলীগের কর্মী এবং সমর্থক হয়ে আছেন তাদের কাছে অনুরোধ, একবার অন্তত চোখ বন্ধ করে ভেবে দেখার চেষ্টা করুন। নিজেদের ভুলগুলোকে একবার দেখা এবং বুঝার চেষ্টা করুন। মুক্ত বিবেকে দেখতে চাইলে সবকিছু একেবারে দিনের আলোর মতোই পরিস্কার। আপনাদের এ ভুলের শুরু সেই স্বাধীনতার পর থেকেই! এবং এখনো চলছে। কারণ অনেক সমর্থক, কর্মীর পোস্টগুলো দেখলেই বুঝতে পারি ওনারা এখনো কেমন একটা অবসেশনের (Obsession) মাঝে দিনাতিপাত করছেন! পর্বত সমান ভুলগুলোকে উপলব্ধি করার চেষ্টাই করেন না। এখনো যদি বুঝতে না পারেন তাহলে আমি এখানে কিছুটা ইঙ্গিত দেয়ার চেষ্টা করছি। বেশি অতীতে না গিয়ে বিগত ১৫ বছরের শাসন আমল থেকেই কয়েকটি বিষয় তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
অ. ১৯৭১ এর মহান স্বাধীনতা এককভাবে আওয়ামীলীগের কোনো কৃতিত্ব নয়। আর বর্তমান আওয়ামীলীগের তো নয়ই। এই আত্ম অহংকার এবং আত্মম্ভরিতা ছাড়ুন এবং ওটাকে ঝোলায় পুড়ে বাজারে বাজারে ফেরি করার ব্যবসা পরিত্যাগ করুন। অন্যের অবদানকেও স্বীকার করতে শিখুন এবং মর্যাদা দিতে অভ্যস্ত হোন। এমন মানসিকতা যুগপৎ দল ও দেশের জন্যেই মঙ্গল নিয়ে আসবে।
আ. সেই জন্মলগ্ন থেকে আপনাদের নিজেদের দলে যে চূড়ান্ত একনায়ক তন্ত্রের চর্চা চলে আসছে, বিগত পনেরো বছর ধরে সেই স্বৈরতন্ত্রই আপনারা দেশের মানুষের উপরে চাপিয়ে দিয়েছিলেন। এ উপলব্ধি আপনাদের এখনো হয়েছে কিনা আমি জানি না। এবং এটা এমনই প্রকট রূপ নিয়েছে যে আপনাদের নেত্রীর অনুপস্থিতিতে পরিস্থিতি কিছুটা হ'লেও সামাল দেয়ার জন্যে এত বড় একটা দলের মাঝ থেকে দ্বিতীয় আর নেতা/নেত্রী খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না! অর্থাৎ আপনাদের চেইন অব অর্ডারে একজনই মাত্র ছিলেন এবং তারপরেই শূণ্যতা! সুতরাং এ সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্যে কী পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন তা আপনারাই ভালো বুঝবেন। তবে বলয়ের বাইরে থেকে তাকালে বেশ বুঝতে পারি, ব্যক্তি পূজা এবং পরিবার পূজার গন্ডী থেকে বেরিয়ে দলের মাঝে আভ্যন্তরীন গণতন্ত্র চর্চার শুরুটা এখন অতীব জরুরী।
ই. দলীয় নেতা নেত্রীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া দলীয় শৃঙ্খলারই একটি অংশ। তবে তা কখনোই অন্ধ ভাবে হওয়া উচিত নয়। এটা বলছি কারণ যে নেত্রীকে আপনারা এতটা বছর পূজার আসনে বসিয়ে অবিসংবাদিত রূপ দিয়েছেন, সেও কিন্তু ভুল এবং সীমাবদ্ধতার উর্ধ্বে কেউ নয়। তার চারিত্রিক কিছু সংকীর্ণতা, প্রতিহিংসা পরায়ণতা, একগুঁয়েমি এবং ক্ষমতার এমন শীর্ষ স্থানে থেকে মাঝে মাঝেই অশালীন কথাবার্তা যে জনমনে অসন্তোষের সৃষ্টি করেছে সেটাও দলীয় ভাবে আপনারা কখনো উপলব্ধি করেছেন কিনা আমার জানা নেই। তবে এর নেতিবাচক প্রভাব রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে বলেই দেশের মানুষ মনে করে। দল এবং দেশের স্বার্থে এ বিষয়গুলো একটু গভীরে গিয়ে খতিয়ে দেখলে ভবিষ্যৎ পদক্ষেপগুলো সঠিক ভাবে নেয়া সহজ হবে বলেই সচেতন মহলের ধারণা।
ঈ. যে কোনো পরিস্থিতিতেই দলে নেতৃত্বে শূণ্যতা একটি দলের নিজের অবয়বে গণতান্ত্রিক চর্চার অন্তঃসার শূণ্যতাকেই তুলে ধরে। বিগত ষোল মাসে দলের এই দূর্বলতা যেন আরও প্রকট রূপে জনমনে প্রশ্ন জাগিয়েছে। দলের নেতা কর্মীরা এটা বুঝতে পারেন কিনা জানি না।
উ. বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে, যদি দেশপ্রেমিক হয়ে থাকেন তবে দেশের স্বার্থ এবং কল্যাণকে সামনে রেখে তৈরী পররাষ্ট্রনীতিতে যেকোনো দেশই আপনাদের বন্ধু আবার যেকোনো দেশই আপনার শত্রু হতে পারে এ বিষয়টা সবসময়ই মনে রাখা প্রয়োজন। এর জন্যে প্রয়োজন দক্ষতা এবং কূটনৈতিক প্রজ্ঞা। কিন্তু দুঃখজনক হ'লেও সত্যি যে, বিগত বছরগুলোতে আপনারা শুধুমাত্র গদিকে টিকিয়ে রাখার জন্যে ভীষণ রকম ভারসাম্যহীন একটি লেনদেনের পথে মাতৃভূমির স্বার্থকে অকাতরে পড়শীর কাছে বিকিয়ে দিয়েছেন! যে সম্পর্কটি তৈরী করেছিলেন তা কোনো বন্ধুত্বের সংগায় পড়ে না। ওটা ছিল শুধু দাসানুদাসের সম্পর্ক!
ঊ. আপনারা আবারও রাজনীতিতে ফিরে আসুন সেটা যেমন আমিও চাই, বিশ্বাস করি দেশের বেশিরভাগ জনগণও চায়। কিন্তু ফিরে আসার পথ কিভাবে তৈরী করবেন, কিভাবে আবারও জনগণের কাছে হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনবেন সে পথ এখন আপনাদেরই খুঁজে বের করতে হবে। পরিশেষে প্রিয় শিল্পী বব মার্লির গানের সেই লাইনটা মনে করিয়ে দিতে চাই 'তুমি একজন মানুষকে একবার বোকা বানাতে পারবে কিন্তু দশজন মানুষকে দশবার নয়' ( You can make fool one person one time but you can't make fool ten persons ten times'--- Bob Marley)!
টরোন্টো নিবাসী বাঙালি কবি, গল্পকার ও প্রাবন্ধিক। তাঁর লেখা প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অন্ধ’।
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!