করপোরেট আগ্রাসন এবং লোকসংস্কৃতির মিউজিয়ামাইজেশন বনাম বাঙালির হাজার বছরের চিরায়ত লোকসংস্কৃতির বিপন্নতা

লেখক: সৌরভ বড়ুয়া
প্রকাশিত হয়েছে : মার্চ ৩০, ২০২৬ | দেখা হয়েছে: ১৮৩ বার

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে বাউল শিল্পী ও তাদের অনুষ্ঠানের ওপর বেশ কিছু হামলার ঘটনা দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের শেষভাগ এবং ২০২৫-২৬ সালের শুরুর দিকে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে।
 
অতি সম্প্রতি ২২শে মার্চ, ২০২৬ রাতে সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার শ্রীপুর গ্রামে এক শতাব্দী প্রাচীন বাউল গানের আসরে হামলার ঘটনা ঘটে। প্রায় শতাধিক ব্যক্তি সংঘবদ্ধ হয়ে তৌহিদি জনতার নাম ভাঙিয়ে ধর্মীয় স্লোগান দিয়ে মঞ্চে উঠে ভাঙচুর চালায় এবং শিল্পীদের বাদ্যযন্ত্র ও সাউন্ড সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত করে। স্থানীয় ইব্রাহিম শাহ মাজারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ ১০০ বছর ধরে এই আসর অনুষ্ঠিত হয়ে আসছিল।
এর আগে নভেম্বর মাসে মানিকগঞ্জে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে বাউল শিল্পী আবুল সরকারকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে আয়োজিত একটি মানববন্ধন কর্মসূচিতে হামলা চালায় একদল উগ্রপন্থী। এই হামলায় অন্তত ৩-৪ জন বাউল শিল্পী ও ভক্ত গুরুতর আহত হন। হামলাকারীরা বাউলদের ওপর লাঠিসোটা নিয়ে আক্রমণ করে এবং অনেককে পুকুরে ফেলে দেয় বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। একই সময়ে ঠাকুরগাঁও ও খুলনায় মানিকগঞ্জের ঘটনার রেশ ধরে ঠাকুরগাঁওয়ে বাউল শিল্পীদের একটি সমাবেশের আগে তাদের ওপর হামলা হয়, যাতে ২ জন শিল্পী আহত হন। একই সময়ে খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বাউল ও মাজার সংশ্লিষ্ট সংস্কৃতি কর্মীদের ওপর ধারাবাহিকভাবে ভীতি প্রদর্শনের খবর পাওয়া গেছে। এসব আক্রমণ কেবল কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এগুলো বাংলাদেশের চিরায়ত সমন্বয়বাদী সংস্কৃতি এবং সংবিধান প্রদত্ত নাগরিক অধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত। 

এই প্রেক্ষাপটে সমসাময়িক সমাজচিন্তার কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। আলোকচিত্রী শহীদুল আলম এর দৃক গ্যালারি, জলের গানের রাহুল আনন্দ বা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর মতো ব্যক্তিত্বদের মাধ্যমে লোকসংস্কৃতিকে 'হেরিটেজ' হিসেবে নির্মাণ এবং এর সঙ্গে 'শহুরে করপোরেট আগ্রাসন' এর সম্পর্ক আমাদের বর্তমান সাংস্কৃতিক সংকটকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে। 

বিষয়টিকে কয়েকটি প্রধান দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে:

লোকসংস্কৃতির 'মিউজিয়ামাইজেশন' বা জাদুঘরকরণ: শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত সমাজ যখন লালন উৎসব বা লোকজ মেলাকে 'হেরিটেজ' হিসেবে ব্র্যান্ডিং করে, তখন তারা অজান্তেই একে সাধারণ মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।

আভিজাত্যের ছাপ: আগে লালনের আখড়ায় বা মেলায় সাধারণ কৃষক-শ্রমিকরা যে স্বতঃস্ফূর্ততায় অংশ নিত, এখন সেখানে ড্রোন শট, প্রফেশনাল ফটোগ্রাফি এবং করপোরেট স্পনসরশিপের দাপট বেশি।

পারফরম্যান্স বনাম ভক্তি: রাহুল আনন্দ বা সমসাময়িক ফিউশন শিল্পীরা যখন লোকগানকে আর্ট গ্যালারিতে বা ড্রয়িংরুমে নিয়ে আসেন, তখন তা আর 'সাধনা' থাকে না, বরং 'পারফরম্যান্স' হয়ে ওঠে। এর ফলে লোকসংস্কৃতির আধ্যাত্মিক শক্তি হারিয়ে তা কেবল বিনোদনের পণ্যে পরিণত হয়।

আরবান করপোরেট আগ্রাসন ও ফারুকী স্টাইল: মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর মতো নির্মাতারা লোকজ উপাদানের সাথে আধুনিক শহুরে জীবনধারার এক ধরণের সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন।

ল্যাংগুয়েজ হাইব্রিডিটি: গ্রামীণ ভাষা বা আঞ্চলিকতাকে যখন 'কুল' (Cool) হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তখন তা অনেক সময় বিকৃত বা হাস্যকরভাবে উপস্থাপন করা হয়। এটি যুবসমাজের কাছে শিকড়ের চেয়ে বরং এক ধরণের 'ফ্যাশন' হিসেবে ধরা দেয়।

ব্র্যান্ডিং: লোকজ মোটিফকে ব্যবহার করে বড় বড় করপোরেট হাউজগুলো তাদের পণ্য বিক্রি করে। যেমন: পহেলা বৈশাখের বিজ্ঞাপনে যে 'লোকজ রূপ' দেখানো হয়, তার সাথে প্রকৃত গ্রামীণ জীবনের কোনো সম্পর্ক থাকে না।

যুবসমাজের ওপর প্রভাব ও সাংস্কৃতিক বিচ্যুতি: এই তথাকথিত 'হেরিটেজ সংরক্ষণ' যুবসমাজের মধ্যে এক ধরণের মেকি সাংস্কৃতিক চেতনা তৈরি করছে।

সারফেস লেভেল কালচার: তরুণ প্রজন্ম লালনের গান শুনছে বা লোকজ পোশাক পরছে, কিন্তু তার ভেতরের দর্শন বা জীবনবোধ গ্রহণ করছে না। এটা অনেকটা 'প্যাকেজ ট্যুরিজম'-এর মতো—একদিনের জন্য লোকজ সাজে মেলায় যাওয়া, কিন্তু বাকি ৩৬৪ দিন ভোগবাদী করপোরেট সংস্কৃতির দাস হয়ে থাকা।

মূল্যবোধের অবক্ষয়: যখন সংস্কৃতি কেবল ফটোসেশন বা সোশ্যাল মিডিয়া কন্টেন্টে সীমাবদ্ধ হয়, তখন মানুষের চিন্তা ও দর্শনে গভীরতা কমে যায়। নিজস্ব শিকড়কে না চিনে কেবল বাহ্যিক রূপকে অনুকরণ করা তরুণদের শেকড়হীন করে তুলছে।

সংরক্ষণের নামে কি ধ্বংস হচ্ছে? দৃক বা বিভিন্ন গ্যালারিতে যখন লোকশিল্প প্রদর্শিত হয়, তখন তা তৃণমূলের শিল্পীদের কতটা লাভবান করে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। অনেক সময় দেখা যায় স্বার্থের সংঘাত; গ্রামীণ শিল্পী অবহেলিতই থেকে যাচ্ছেন, অথচ সেই শিল্পকে 'কিউরেট' করে শহুরে এলিটরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি ও অর্থ পাচ্ছেন।

জীবনযাত্রা বনাম শৌখিনতা: লোকসংস্কৃতি হলো একটি জীবনধারা (Way of life), এটি কোনো শো-পিস নয়। যখন একে 'সংরক্ষণ'-এর নামে ফ্রেমে বন্দি করা হয়, তখন এর স্বাভাবিক বিবর্তন থমকে যায়। যা বলা যায় তা মূলত লোকসংস্কৃতির 'বাণিজ্যিক আত্মসাৎ'। যখন শহর থেকে গ্রামে গিয়ে সংস্কৃতি রক্ষা করার চেষ্টা করা হয়, তখন তা অনেক সময় 'সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ' (Cultural Hegemony) হিসেবে কাজ করে। এটি লোকজ মানুষের সহজ ও গভীর জীবনবোধকে করপোরেট চাকচিক্যের নিচে চাপা দিয়ে দেয়।

গ্যালারি-নির্ভর কিউরেশন বা করপোরেট ফিউশনের বিপরীতে এস এম সুলতান, শাহ আবদুল করিম বা লালন সাঁইয়ের জীবনদর্শন ছিল মূলত একটি 'রেজিস্ট্যান্স' প্রতিরোধ বা প্রতিবাদ। তাঁদের চর্চা কোনো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরের পণ্য ছিল না, বরং তা ছিল মাটি ও মানুষের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত।
তাদের এই 'বিপরীত' ধারার বৈশিষ্ট্যগুলো একটু লক্ষ্য করলে বুঝা যায়।

এস এম সুলতানের পেশিবহুল কৃষক: সুলতান যখন ইউরোপ-আমেরিকা ঘুরে এসেও নড়াইলের মাটিতে ফিরে যান, তখন তিনি করপোরেট দুনিয়ার 'দুর্বল গ্রামীণ' ইমেজের বিপরীতে কৃষকদের লড়াকু ও শক্তিশালী হিসেবে আঁকেন। তার কাছে ছবি আঁকা ছিল শিকড় খোঁজার এক নিরন্তর সংগ্রাম, যা কোনো গ্যালারির দেয়ালে সীমাবদ্ধ থাকতে চায়নি। এস এম সুলতান ফাউন্ডেশন থেকে তাঁর এই লোকজ জীবনদর্শন সম্পর্কে আরো বিস্তর ধারণা পাওয়া যায়।

শাহ আবদুল করিমের মাটির গান: হাওর অঞ্চলের এই সাধক অর্থের অভাবেও নিজের গান কোনো কোম্পানির কাছে বিক্রি করতে চাননি। তার গান ছিল সাধারণ মানুষের অধিকার ও সাম্যের কথা বলার হাতিয়ার। যখন করপোরেট মিডিয়া তার গানকে 'পপ' বা 'রিমিক্স' করে, তখন তার অন্তর্নিহিত আধ্যাত্মিক ও দ্রোহের সুরটি হারিয়ে যায়। শাহ আবদুল করিমের জীবনী পড়লে তাঁর ত্যাগের মহিমা স্পষ্ট হয়।

লালন শাহের মরমী দর্শন: লালনের জীবন ছিল জাত-পাত এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বিরুদ্ধে এক নীরব বিপ্লব। আধুনিক মেকি 'লালন উৎসব' যেখানে কেবল বাদ্যযন্ত্রের ধমক, সেখানে লালনের মূল দর্শন ছিল 'মনুষ্যত্ব' ও 'আত্মা'। ছেঁউড়িয়ায় যখন করপোরেট ব্র্যান্ডিং ঢোকে, তখন লালনের সেই নিভৃত সাধনাটি পর্যটন পণ্যে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। লালন একাডেমি এই দর্শনের মূল ধারাকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে।

পার্থক্য যেখানে স্পষ্ট:
১. করপোরেট আগ্রাসন খোঁজে 'ব্র্যান্ড ভ্যালু', আর এই সাধকরা খুঁজেছেন 'মুক্ত চেতনা'।
২. ফারুকী বা রাহুল আনন্দদের উপস্থাপনায় যা একটি 'প্রজেক্ট', সুলতান বা করিমের কাছে তা ছিল 'অস্তিত্ব'।
৩. করপোরেট কালচার যুবসমাজকে করে 'ভোক্তা', আর এই মহাজনেরা মানুষকে করতে চেয়েছিলেন 'সংগ্রামী'।
এই বরেণ্য ব্যক্তিদের মূল কাজগুলো আজ ডিজিটাল আর্কাইভ বা জাতীয় জাদুঘরের মাধ্যমে সংরক্ষণের চেষ্টা চলছে যাতে মূল রূপ বিকৃত না হয়।

গ্যালারি কালচার আর করপোরেট আগ্রাসনের হাতে যা বাকি ছিল, এনজিও-রা এসে তাকে পূর্ণাঙ্গ 'পণ্য' বা 'প্রজেক্ট'-এ রূপান্তর করেছে। লোকসংস্কৃতিকে যখন এনজিও-রা তাদের এজেন্ডার অংশ বানায়, তখন সেটি আর স্বতঃস্ফূর্ত জনসংস্কৃতি থাকে না, হয়ে ওঠে 'ফান্ডিং জেনারেট' করার হাতিয়ার।

এনজিও-দের এই ভূমিকার নেতিবাচক দিকগুলো হলো:

সংস্কৃতিকে ‘পণ্য’ বানানো (Commodification): এনজিও-রা লোকশিল্পীদের নিয়ে 'আর্টিসান গ্রুপ' তৈরি করে। এতে শিল্পীর সৃজনশীলতা হারিয়ে যায় এবং তিনি একজন দক্ষ শ্রমিকের মতো নির্দিষ্ট ফরম্যাটে নকশা বা গান তৈরি করতে বাধ্য হন, যা মূলত বিদেশের বাজারে বা শহরের শৌখিন দোকানে চড়া দামে বিক্রির জন্য।

বিজাতীয় বার্তা আরোপ: পটগান বা জারিগানের মতো ঐতিহ্যবাহী মাধ্যমগুলোকে এনজিও-রা তাদের স্বাস্থ্য সচেতনতা, পরিবার পরিকল্পনা বা ক্ষুদ্রঋণের প্রচারণার বাহন হিসেবে ব্যবহার করে। এর ফলে লোকজ শিল্পের যে নিজস্ব আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক গভীরতা (যেমন লালন বা করিমের দর্শন), তা হারিয়ে গিয়ে সেটি কেবল 'প্রপাগান্ডা'-তে পরিণত হয়।

দাতা সংস্থার প্রেসক্রিপশন: বিদেশি দাতা সংস্থাগুলোর (Donor Agencies) চাহিদা অনুযায়ী ফোক কালচারকে ‘রিপ্রেজেন্ট’ করা হয়। তারা যেভাবে দেখতে চায়—অর্থাৎ দারিদ্র্যকে রোমান্টিক রূপ দিয়ে বা লোকজ জীবনকে আদিম হিসেবে উপস্থাপন করে—এনজিও-রা সেই চিত্রই তুলে ধরে। এটি মূলত একটি 'সাংস্কৃতিক কলোনিয়ালিজম'।

উৎসবের কৃত্রিমতা: নবান্ন বা চৈত্র সংক্রান্তির মতো উৎসবগুলো এখন গ্রাম থেকে এনজিও-র সেমিনার কক্ষে বা বড় বড় হোটেলের লবিতে চলে এসেছে। এতে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ থাকে না, থাকে দাতা সংস্থা ও এলিটদের পদচারণা। ব্র্যাক (BRAC) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো লোকজ কারুশিল্পকে ব্র্যান্ডিংয়ের চূড়ায় নিলেও, এর ফলে গ্রামীণ কারিগরের নিজস্ব শিল্পসত্তা কতটুকু টিকে আছে তা নিয়ে অনেক সমাজতাত্ত্বিকের প্রশ্ন রয়েছে।

শিল্পীর নিঃস্বকরণ: সুলতান বা করিম যেভাবে অভাবের মধ্যেও দর্শনের সাথে আপস করেননি, এনজিও-নির্ভর ব্যবস্থায় শিল্পীরা হয়ে পড়েন সুযোগসন্ধানী। ভাতার লোভে বা বিদেশে পারফর্ম করার আশায় তারা তাদের শিকড় বিসর্জন দিয়ে এনজিও-র ছাঁচে তৈরি সংস্কৃতির চর্চা শুরু করেন।

সারকথা: এনজিও-রা লোকসংস্কৃতিকে 'সংরক্ষণ' করার কথা বললেও তারা মূলত একে এর সামাজিক প্রেক্ষাপট (Context) থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি 'প্যাকেজ' বানিয়ে ফেলে। এতে যুবসমাজের কাছে সংস্কৃতি কেবল একটি এনজিও-ব্র্যান্ড বা শৌখিন জীবনধারার অংশ হিসেবে ধরা দেয়, যার সাথে এস এম সুলতানের 'লড়াকু মানুষ' বা শাহ আবদুল করিমের 'গণমানুষের সংগ্রাম'-এর কোনো সম্পর্ক নেই।
আমরা কি মনে করি এই এনজিও কালচার থেকে বেরিয়ে আসার জন্য তৃণমূলের কোনো স্বাধীন সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সম্ভাবনা বাংলাদেশে এখনো বেঁচে আছে?

বাংলাদেশে বর্তমানে আমরা তথাকথিত (so-called) যে 'সাংস্কৃতিক বিপ্লব' বা জাগরণ দেখছি, তা আসলে অনেক ক্ষেত্রে তরুণদের ধ্বংসাত্মক রাজনীতির একটি পরিপূরক উপাদান হিসেবে কাজ করছে। আমরা যে করপোরেট আগ্রাসন এবং এনজিও-নির্ভর হেরিটেজ কালচারের কথা বলছি, এই ‘বিপ্লব’ তারই একটি মোড়ক মাত্র। এই তথাকথিত সাংস্কৃতিক বিপ্লব কেন ধ্বংসাত্মক রাজনীতির সহায়ক হয়ে উঠছে, তার কিছু নিগূঢ় কারণ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়-

বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতা ও 'ইমোশনাল ম্যানিপুলেশন': এই তথাকথিত বিপ্লবগুলো মাটির গভীর থেকে আসে না, বরং এগুলো তৈরি করা হয় সোশ্যাল মিডিয়া ল্যাবে।

স্লোগান সর্বস্বতা: এস এম সুলতান বা লালনের যে গভীর জীবনদর্শন, তা বাদ দিয়ে কেবল ওপরতলার কিছু প্রতীক (যেমন নির্দিষ্ট পোশাক, গান বা লব্জ) ব্যবহার করে তরুণদের মধ্যে একটি কৃত্রিম 'উত্তেজনা' তৈরি করা হয়।

পরিণাম: এই উত্তেজনা যখন কোনো যৌক্তিক বা দার্শনিক ভিত্তি পায় না, তখন তা সহজেই রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

এনজিও ও করপোরেটদের 'সেফ স্পেস' থিওরি: করপোরেট শক্তি ও এনজিও-রা চায় তরুণরা এমন এক সংস্কৃতিতে মগ্ন থাকুক যা দেখতে 'বিপ্লবী' মনে হলেও আসলে তা রাষ্ট্র বা ব্যবস্থার কোনো মৌলিক পরিবর্তন চায় না।

বিরাজনীতিকরণ: এই সোকল্ড সাংস্কৃতিক বিপ্লব তরুণদের বোঝায় যে—গান গাওয়া, কনসার্ট করা বা গ্রাফিতি আঁকাই হলো একমাত্র প্রতিবাদ। এর ফলে সত্যিকারের রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের লড়াই থেকে তারা বিচ্যুত হয়ে পড়ে।

বিজাতীয় এজেন্ডা: বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত এই সাংস্কৃতিক প্রজেক্টগুলো তরুণদের মধ্যে এমন এক 'উদারবাদ' প্রচার করে যা আসলে আমাদের দেশীয় প্রেক্ষাপট ও মূল্যবোধের সাথে সাংঘর্ষিক, ফলে সমাজে এক ধরণের মেরুকরণ ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়।

লোকজ সংস্কৃতির অপব্যবহার: লালন বা শাহ আবদুল করিমের নাম নিয়ে যে উৎসবগুলো হয়, সেগুলোতে এখন আর 'অধিকারের লড়াই' নেই।

ফ্যাশন হিসেবে বিপ্লব: চে গুয়েভারা বা লালনের ছবি টি-শার্টে পরা এখন এক ধরণের করপোরেট ফ্যাশন। এই ফ্যাশনটি যখন তরুণদের রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ হয়, তখন তা হয়ে ওঠে অন্তঃসারশূন্য।

সহিংসতার রোমান্টিকীকরণ: তথাকথিত সাংস্কৃতিক বিপ্লবের নামে অনেক সময় ধ্বংসাত্মক রাজনীতি বা ভাঙচুরকে 'শৈল্পিক' রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, যা তরুণদের বিপথগামী করে।

পরিচয় সংকট ও 'কাল্ট' সংস্কৃতি: বর্তমানে তরুণদের মধ্যে নিজস্ব চিন্তা ও যুক্তির চেয়ে কোনো নির্দিষ্ট 'আইকন' বা 'কাল্ট'-কে অন্ধভাবে অনুসরণ করার প্রবণতা দেখা যায়।

ফারুকী বা অন্যান্য আইকন: যখন চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বা সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট জীবনবোধ চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন তরুণরা নিজেদের স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলে। এই মানসিক দাসত্বই তাদের ধ্বংসাত্মক রাজনীতির হাতিয়ারে পরিণত করে, কারণ তারা তখন অন্যের দেওয়া 'ন্যারেটিভ' অনুযায়ী কাজ করে।

শিকড়হীন আধুনিকতা: এস এম সুলতানের সেই পেশিবহুল কৃষক আজ জিম-সেন্টারের বডিবিল্ডারে রূপান্তরিত হয়েছে আর শাহ আবদুল করিমের গান হয়ে গেছে দামি ক্যাফেটেরিয়ার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক।

শিকড়ের বিচ্ছিন্নতা: সংস্কৃতি যখন শিকড় হারায়, তখন সমাজও ভারসাম্য হারায়। এই ভারসাম্যহীন যুবসমাজ তখন উগ্রবাদ, অসহিষ্ণুতা এবং ধ্বংসাত্মক রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ে, কারণ তাদের সামনে কোনো টেকসই আদর্শিক মডেল নেই।

মোটাদাগে বলা যায় এই তথাকথিত সাংস্কৃতিক বিপ্লব আসলে এক ধরণের 'কালচারাল ইন্ডাস্ট্রি' যা তরুণদের আসল সমস্যা (যেমন বেকারত্ব, বৈষম্য, বাকস্বাধীনতা) থেকে দূরে সরিয়ে রাখে এবং তাদের শক্তিকে ক্ষতিকর পথে পরিচালিত করে। এটি মূলত সুলতান বা লালনের সেই 'মুক্তিকামী মানুষের' বিপরীতে একদল 'সাংস্কৃতিক রোবট' তৈরি করার প্রক্রিয়া।

এই কৃত্রিম সাংস্কৃতিক বলয় ভেঙে পুনরায় সত্যিকারের লোকজ ও গণমুখী সংস্কৃতিতে ফিরে যাওয়া এই মুহূর্তে কি সম্ভব? নাকি করপোরেট জাল অনেক বেশি শক্ত হয়ে গেছে সেটা ভেবে দেখার সময় ফুরিয়ে আসছে বৈকি।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে করপোরেট মিডিয়ার আগ্রাসন কেবল তথ্যের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করছে না, বরং এটি সমাজের মনস্তাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোকে আমূল বদলে দিচ্ছে। এস এম সুলতান বা শাহ আবদুল করিম যে গণমানুষের সংস্কৃতির কথা বলতেন, করপোরেট মিডিয়া তাকে একটি নির্দিষ্ট ‘পণ্য’ হিসেবে ফ্রেমবন্দি করে ফেলেছে।

করপোরেট মিডিয়ার এই আগ্রাসনের মূল দিকগুলো একবার পরখ করে দেখা যাক;
সংবাদ ও জনমতের 'ম্যানুফ্যাকচারিং': বর্তমানে মিডিয়া হাউসগুলো বড় বড় করপোরেট গ্রুপের মালিকানাধীন। ফলে সংবাদ এখন আর নিরপেক্ষ তথ্য নয়, বরং মালিকপক্ষের ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে গন্য হওয়াটাই স্বাভাবিক নয় কি?

এজেন্ডা সেটিং: জনগণের মৌলিক সমস্যা (যেমন দ্রব্যমূল্য বা অধিকার) নিয়ে আলোচনার চেয়ে মিডিয়া এমন সব ‘সফট নিউজ’ বা বিনোদনমূলক বিতর্ক তৈরি করে, যা তরুণদের মূল রাজনীতি থেকে বিচ্যুত রাখে।

সেন্সরশিপ: করপোরেট স্বার্থের বিরুদ্ধে যায় এমন কোনো সংবাদ বা লোকজ আন্দোলনের খবর এই মিডিয়াগুলোতে স্থান পায় না।

লোকসংস্কৃতির 'পণ্যিকরণ': পহেলা বৈশাখ, লালন উৎসব বা লোকজ মেলাকে করপোরেট মিডিয়া একটি 'গ্ল্যামারাস ইভেন্ট' হিসেবে উপস্থাপন করে, আর আমারা ভাবি তারাতো স্পনসর করছে।

রিয়েলিটি শো কালচার: বাউল বা লোকসংগীতকে রিয়েলিটি শোর মাধ্যমে বিচার করা হচ্ছে। এতে গানের আধ্যাত্মিকতা হারিয়ে যাচ্ছে এবং শিল্পীরা করপোরেট ব্র্যান্ডের দাসে পরিণত হচ্ছেন। শাহ আবদুল করিমের গানের সেই মাটির সুরকে 'ইলেকট্রনিক বিট' দিয়ে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে। 

বিজ্ঞাপনী আগ্রাসন: মিডিয়া এমন এক জীবনধারা প্রচার করে যা ভোগবাদকে উসকে দিচ্ছে। ফলে গ্রামীণ সহজ জীবনযাত্রার পরিবর্তে তরুণরা এক ধরণের 'শহুরে হীনম্মন্যতায়' ভোগে।

'সো-কল্ড' বুদ্ধিজীবী ও কালচারাল আইকন তৈরি: করপোরেট মিডিয়া নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিকে (যেমন ফারুকী বা রাহুল আনন্দ বা আরো অনেক) 'সাংস্কৃতিক আইকন' হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।

বিকল্প কণ্ঠস্বর দমন: যারা এস এম সুলতানের মতো আপসহীন বা মাটির কাছাকাছি থেকে কাজ করেন, মিডিয়া তাদের অবহেলা করে। বদলে এমন এক শ্রেণির বুদ্ধিজীবী তৈরি করা হয় যারা করপোরেট ও বিদেশি এজেন্ডার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কথা বলেন।

বিপ্লবের রোমান্টিকীকরণ: সত্যিকারের রাজনৈতিক সংগ্রামের বদলে মিডিয়া একটি 'এস্থেটিক' বা নান্দনিক বিপ্লবের ছবি দেখায়, যা আদতে সমাজ পরিবর্তনে কোনো ভূমিকা রাখে না বরং তার উল্টোটাই করে।

ডিজিটাল অ্যালগরিদম ও যুবসমাজের অবক্ষয়: ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে মিডিয়া আগ্রাসন এখন কেবল টেলিভিশনে সীমাবদ্ধ নেই, এটি ওটিটি প্ল্যাটফর্ম এবং সোশ্যাল মিডিয়া শর্টসের মাধ্যমে প্রতিটি তরুণের হাতে পৌঁছে গেছে।

অ্যাটেনশন ইকোনমি: তরুণদের মনোযোগকে ছোট ছোট ক্লিপ বা অর্থহীন বিতর্কে আটকে রাখা হচ্ছে। এতে তাদের গভীর চিন্তা করার ক্ষমতা লোপ পাচ্ছে, যা আমরা 'ধ্বংসাত্মক রাজনীতি'র কারণ হিসেবে ভেবে দেখার যথেষ্ট কারণ।

সাংস্কৃতিক হাইব্রিডিটি: মিডিয়া এমন এক ভাষা ও সংস্কৃতি (যেমন 'হিংলিশ' বা বিকৃত আঞ্চলিকতা) প্রচার করছে যা তরুণদের তাদের মূল শিকড় ও ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে।

এনজিও ও বিদেশি নব্য-উপনিবেশবাদ: মিডিয়া অনেক সময় বিদেশি অর্থপুষ্ট এনজিও-র তৈরি 'ন্যারেটিভ' প্রচার করে। হেরিটেজ সংরক্ষণের নামে তারা মূলত আমাদের লোকসংস্কৃতিকে পশ্চিমাদের কাছে একটি 'এক্সোটিক' বা অদ্ভুত দর্শনীয় বস্তু হিসেবে তুলে ধরে। এতে স্থানীয় মানুষের আত্মমর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়।

সারকথা: করপোরেট মিডিয়ার এই আগ্রাসন মূলত 'সংস্কৃতির বিনোদনকরণ'। যখন সংস্কৃতি কেবল বিনোদন হয়ে যায়, তখন তা আর সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার থাকে না। সুলতানের আঁকা সেই পেশিবহুল কৃষক বা লালনের 'মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি'—এই দর্শনগুলো করপোরেট মিডিয়ার চাকচিক্যে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে, যা যুবসমাজকে এক ধরণের আদর্শিক শূন্যতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
আমরা কি বিকল্প ধারার স্বাধীন মিডিয়া বা গণ-আন্দোলন কি এই করপোরেট জাল ছিঁড়তে পারবো?

বাংলা লোক সংস্কৃতির 'মিউজিয়ামাইজেশন' বা একে একটি প্রাণহীন প্রদর্শনীতে পরিণত করার আরও কিছু বাস্তব উদাহরণ উল্লেখ করা যায়, যা আমাদের চিন্তার ধারাকে আরও স্পষ্ট করবে:

নকশি কাঁথার 'আড়ং-করণ' (The Aarong-ization of Nakshi Kantha): নকশি কাঁথা একসময় ছিল গ্রামীণ নারীর সুখ-দুঃখের ব্যক্তিগত আখ্যান। এনজিও এবং করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো একে ড্রয়িংরুমের শোপিস বা রানওয়ে ফ্যাশনে রূপান্তরিত করেছে। এখন কাঁথার ফোঁড়ে আর গল্প থাকে না, থাকে দাতা সংস্থার দেওয়া 'স্পেসিফিকেশন' আর বিদেশের বাজারের চাহিদা। শিল্পটি নারীর স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ থেকে বিচ্যুত হয়ে সস্তা শ্রমের পণ্যে পরিণত হয়েছে।

শহুরে রিসোর্টে কৃত্রিম গ্রাম (Synthetic Villages in Resorts): শহরের অদূরে গড়ে ওঠা পাঁচতারা রিসোর্টগুলোতে এখন 'কৃত্রিম গ্রাম' বানানো হয়। সেখানে টাকার বিনিময়ে 'চৌকিদার', 'কামার' বা 'কুমার' রাখা হয় যাতে পর্যটকরা লোকজ জীবনের ছোঁয়া পায়। এটিই মিউজিয়ামাইজেশনের চূড়ান্ত রূপ—যেখানে জ্যান্ত মানুষকে কাঁচের ওপারের বস্তুর মতো প্রদর্শন করা হয়, আর লোকসংস্কৃতি হয়ে ওঠে ধনীদের উইকএন্ড বিনোদন।

পুতুলনাচের বিলুপ্তি ও গ্যালারি ডিসপ্লে: একসময় পুতুলনাচ ছিল গ্রামীণ জনপদে সামাজিক অসঙ্গতি তুলে ধরার মাধ্যম। এখন এটি মেলা থেকে হারিয়ে গিয়ে কেবল শিল্পকলা একাডেমির গ্যালারিতে বা নির্দিষ্ট কোনো ফেস্টিভ্যালে পারফরম্যান্স আর্ট হিসেবে টিকে আছে। এর যে 'গণমুখী' চরিত্র ছিল, তা হারিয়ে এটি এখন কেবল একটি 'বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্য' হিসেবে উপস্থাপিত হয়।

জারি-সারি গান যখন ওটিটি প্ল্যাটফর্মে: জারি বা সারি গান ছিল সামষ্টিক শ্রম বা শোকের বহিঃপ্রকাশ। এখন করপোরেট মিডিয়া একে স্টুডিওর চার দেয়ালের ভেতর হাই-ডেফিনিশন ক্যামেরা আর আধুনিক বাদ্যযন্ত্র দিয়ে রেকর্ড করে ইউটিউব বা ওটিটি প্ল্যাটফর্মে ছাড়ে। এতে গানের মূল মেজাজ (Soul) হারিয়ে যায় এবং এটি কেবল একটি 'অডিও-ভিজ্যুয়াল কন্টেন্ট' হিসেবে সংরক্ষিত থাকে।

মৃৎশিল্পের 'টেরাকোটা টাইলস': মাটির হাড়ি-পাতিল বা শখের হাঁড়ি এখন আর দৈনন্দিন ব্যবহারের বস্তু নয়। করপোরেট অফিস বা অভিজাত হোটেলের দেয়ালে মাটির কারুকাজকে 'টেরাকোটা টাইলস' হিসেবে সেঁটে দেওয়া হয়। এর ফলে মৃৎশিল্পীরা তাদের স্বকীয়তা হারিয়ে করপোরেট ইন্টেরিয়র ডিজাইনারদের নির্দেশে কাজ করা দর্জি বা মিস্ত্রিতে পরিণত হচ্ছেন।

পহেলা বৈশাখ ও প্লাস্টিক সংস্কৃতি: বৈশাখী মেলায় একসময় বাঁশের বাঁশি, শোলার পাখি আর মাটির পুতুলের আধিপত্য ছিল। এখন মিউজিয়ামাইজেশনের চাপে সেই মেলাগুলোও করপোরেট স্পনসরশিপের কবলে। মাটির সানকি আর পান্তা-ইলিশ এখন ডিজিটাল বিলবোর্ডে বন্দি, যা কেবল একদিনের 'ফটো সেশন' হিসেবে বেঁচে থাকে।

এই প্রক্রিয়াটি লোকসংস্কৃতিকে কোনো নিরাপদ স্থানে সংরক্ষণ করে না, বরং একে এর পরিবেশ ও জনবিচ্ছিন্ন (De-contextualized) করে ফেলে। এস এম সুলতান যে মাটির সোঁদা গন্ধ আর বলিষ্ঠ মানুষের কথা বলতেন, মিউজিয়ামাইজেশনের ফলে সেই মানুষগুলো এখন কেবল ক্যাটালগের ছবি।
আমরা কি মনে করতে পাড়ি, লোকজ শিল্পের এই বাণিজ্যিক প্রদর্শন কি নতুন প্রজন্মের কাছে সংস্কৃতির ভুল ইতিহাস পৌঁছে দিচ্ছে?

বাংলার লোকসংস্কৃতিকে করপোরেট পণ্যে রূপান্তর, এনজিও-নির্ভর 'হেরিটেজ' ব্র্যান্ডিং এবং মিউজিয়ামাইজেশনের এই প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম বারবার আলোচনায় আসে। উত্থাপিত বিষয়গুলোর আলোকে তাদের ভূমিকার একটি চিত্র;

১. প্রভাবশালী ব্যক্তি (সাংস্কৃতিক আইকন ও নির্মাতা)
এঁরা লোকজ উপাদানকে আধুনিকায়ন বা 'কুল' (Cool) করে শহুরে তরুণদের কাছে উপস্থাপনের কারিগর:
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী: প্রান্তিক ভাষা ও জীবনবোধকে বিজ্ঞাপনী ঢঙে এবং 'আরবান-ফোক' স্টাইলে উপস্থাপনের মাধ্যমে সংস্কৃতির একটি কৃত্রিম হাইব্রিড রূপ তৈরি করেছেন।
রাহুল আনন্দ (জলের গান): লোকজ বাদ্যযন্ত্র ও গানের সুরকে ড্রয়িংরুম বা গ্যালারি আর্ট হিসেবে জনপ্রিয় করেছেন, যা মূল লোকজ ধারার চেয়ে একটি শৌখিন সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে।
শমী কায়সার ও বিভিন্ন সেলিব্রিটি কিউরেটর: যারা বিভিন্ন মেলা বা উৎসবে 'কালচারাল অ্যাম্বাসেডর' হিসেবে কাজ করে লোকসংস্কৃতিকে করপোরেট ব্র্যান্ডের সাথে যুক্ত করেন।

২. প্রতিষ্ঠান (করপোরেট ও এনজিও)
এঁরা লোকশিল্পকে বাণিজ্যিক পণ্য বা প্রদর্শনীতে রূপান্তরের প্রধান চালিকাশক্তি:
আড়ং (ব্র্যাক): নকশি কাঁথা, মৃৎশিল্প ও তাঁতশিল্পকে গ্রামীণ প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে উচ্চবিত্তের লাইফস্টাইল ব্র্যান্ডে পরিণত করার পথপ্রদর্শক।
দৃক গ্যালারি: লোকজ জীবন ও সংগ্রামকে ফটোগ্রাফি ও গ্যালারি ডিসপ্লের মাধ্যমে 'এলিট' বা উচ্চবিত্তের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় সীমাবদ্ধ করার অভিযোগ রয়েছে।
বেঙ্গল ফাউন্ডেশন: উচ্চাঙ্গ সংগীত ও লোকসংগীতকে করপোরেট স্পনসরশিপের মাধ্যমে বড় বড় উৎসবে রূপান্তর করা, যেখানে সাধারণ মানুষের চেয়ে শহুরে শ্রেণির আধিপত্য বেশি।
ইউনিলিভার ও বিভিন্ন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি: যারা 'সানসিল্ক পহেলা বৈশাখ' বা 'গ্রামীণফোন বৈশাখী মেলা'র মতো ইভেন্টের মাধ্যমে উৎসবের স্বতঃস্ফূর্ততা কেড়ে নিয়ে তাকে স্রেফ বিজ্ঞাপনী প্রচারণায় পরিণত করেছে।

৩. মিডিয়া ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম
চ্যানেল আই: 'পান্তা-ইলিশ' ও 'হাজারো কণ্ঠে বর্ষবরণ'-এর মতো ইভেন্টের মাধ্যমে গ্রামীণ উৎসবকে বাণিজ্যিক ও মিডিয়া-নির্ভর উৎসবে রূপান্তর করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে।
ওটিটি প্ল্যাটফর্ম (যেমন চরকি বা হইচই): লোকজ গল্প বা বাউল জীবনকে রোমান্টিক ও রহস্যময় (Exotic) করে চিত্রিত করার মাধ্যমে তরুণদের মধ্যে এক ধরণের বিভ্রান্তিকর সাংস্কৃতিক চেতনা তৈরি করছে।

৪. লোকজ ঐতিহ্যের 'মিউজিয়ামাইজেশন' কেন্দ্র
বিলাসবহুল রিসোর্টসমূহ (যেমন সারাহ রিসোর্ট, গ্র্যান্ড সুলতান ইত্যাদি): যারা মাটির ঘর বা বাউল গানকে কেবল পর্যটকদের বিনোদনের জন্য 'সাজিয়ে' রাখে।
এনজিও পরিচালিত ইউথ লিডারশিপ সেন্টার: যারা লোকজ দর্শনকে বাদ দিয়ে পশ্চিমা 'এপলিটিক্যাল' নেতৃত্বের শিক্ষা দেয়।
আমাদের কি মনে হয়, এই ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বাইরে তৃণমূল পর্যায়ে এমন কোনো শক্তি আছে যারা এখনো এস এম সুলতান বা শাহ আবদুল করিমের আপোসহীন ধারাকে ধারণ করছে?

করপোরেট গ্ল্যামার এবং এনজিও-নির্ভর 'হেরিটেজ' সংস্কৃতির বিপরীতে দাঁড়িয়ে যারা আজও মাটি, মানুষ এবং দর্শনের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে লোকসংস্কৃতির প্রকৃত সংগ্রাম ও সাধনা চালিয়ে যাচ্ছেন, তাদের অবদানই মূলত আমাদের শিকড়কে বাঁচিয়ে রেখেছে।
এমন কিছু নিভৃতচারী শিল্পী, সাধক ও প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে :

১. সত্যিকারের উত্তরসূরি ও শিল্পী (ব্যক্তিগত সাধনা)
এঁরা লাইমলাইটের তোয়াক্কা না করে শাহ আবদুল করিম বা লালনের দর্শনে জীবন অতিবাহিত করছেন:
কফিল আহমেদ: শিল্পী ও কবি। করপোরেট মিডিয়ার প্রলোভন উপেক্ষা করে তিনি তাঁর গানে ও ছবিতে কৃষক, শ্রমিক এবং প্রান্তিক মানুষের অধিকার ও সংগ্রামের কথা বলেন। তাঁর শিল্পচর্চা মূলত করপোরেট আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ প্রতিবাদ।
কৃষ্ণকলি ইসলাম: বাণিজ্যিক ফিউশনের ভিড়েও তিনি লোকজ সুরের আদি রূপ এবং মাটির গন্ধকে অক্ষুণ্ণ রেখে গান চর্চা করেন।
রণেশ ঠাকুর: শাহ আবদুল করিমের সাক্ষাৎ শিষ্য। হাওর অঞ্চলের প্রতিকূলতার মাঝেও তিনি করিমের গানের আদি সুর ও দর্শনকে অবিকৃত রেখে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে শেখাচ্ছেন।
টুনটুন বাউল ও শফি মন্ডল: যদিও শফি মন্ডল এখন অনেক বড় প্ল্যাটফর্মে গান, তবে তিনি এখনো লালনের সেই নিগূঢ় ঘরানাকে লালন করেন এবং অজস্র শিষ্য তৈরি করছেন যারা করপোরেট চাকচিক্যের বাইরে সাধনায় মগ্ন।

২. প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন (তৃণমূল চর্চা)
যাদের লক্ষ্য 'ব্র্যান্ডিং' নয়, বরং সংস্কৃতির 'অস্তিত্ব' রক্ষা করা:
উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী: দীর্ঘ সময় ধরে গ্রাম-গঞ্জে ঘুরে লোকজ গান ও নাটকের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের অধিকারের কথা বলছে। তারা করপোরেট স্পনসরশিপ ছাড়াই সদস্য ও জনগণের চাঁদায় তাদের সাংস্কৃতিক লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
আরশিনগর (কুষ্টিয়া): লালন সাঁইয়ের মরমী দর্শন এবং বাউল জীবনধারাকে কোনো প্রদর্শনী বা বাণিজ্য ছাড়াই এর নিজস্ব মেজাজে চর্চা ও গবেষণার একটি কেন্দ্র।
প্রাচ্যনাট (সহজাত ধারা): যদিও তারা শহরে কাজ করে, তবে তাদের অনেক কাজই মাটির কাছাকাছি মানুষের জীবন ও সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি এবং তারা লোকজ ফর্মগুলোকে স্রেফ 'শোপিস' হিসেবে ব্যবহার না করে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করে।
লোকজ নাট্যদল (তৃণমূল পর্যায়ের): কুষ্টিয়া, নেত্রকোনা বা হাওর অঞ্চলের বিভিন্ন ছোট ছোট নাট্যদল যারা কিচ্ছা-কাহিনী, পালগান বা পুতুলনাচকে এখনো বিনোদনের চেয়ে সামাজিক শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে।

৩. গবেষক ও সংগ্রাহক (তৃণমূল ভিত্তিক)
সাইমন জাকারিয়া: তিনি করপোরেট হেরিটেজ ব্র্যান্ডিংয়ের বাইরে গিয়ে মাঠ পর্যায়ে ঘুরে লোকজ গান ও শিল্পীদের জীবন নথিবদ্ধ করছেন। তাঁর কাজ মূলত লোকসংস্কৃতিকে মিউজিয়ামে রাখা নয়, বরং এর জীবন্ত রূপটিকে মানুষের সামনে আনা।
ড. এম এ মোমেন: লোকসংস্কৃতির সমাজতাত্ত্বিক দিকগুলো নিয়ে নিভৃতে কাজ করা একজন গবেষক, যিনি করপোরেট আগ্রাসনের বিপক্ষেই সর্বদা কলম ধরেছেন।
পাভেল পার্থ বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য গবেষক, লেখক এবং আদিবাসী ও লোকসংস্কৃতি বিশ্লেষক। পাভেল পার্থ সেই লড়াইয়ের ময়দানের একজন অগ্রগণ্য তাত্ত্বিক ও সক্রিয় কর্মী।

পার্থক্য যেখানে:
এঁদের চর্চায় এস এম সুলতানের সেই শক্তিশালী কৃষক কেবল ক্যানভাসে নয়, বাস্তবেও লড়াই করার প্রেরণা পায়। এঁদের কাছে শাহ আবদুল করিমের গান কেবল সুর নয়, শোষণের বিরুদ্ধে স্লোগান। এঁরা সংস্কৃতিকে 'সংরক্ষণ' করতে চান না, বরং একে মানুষের প্রতিদিনের জীবনের 'সংগ্রামের সঙ্গী' হিসেবে দেখতে চান।
আমরা কি মনে করতে পারি, বর্তমানের ডিজিটাল যুগে এই নিভৃতচারী শিল্পীদের লড়াই কি করপোরেট মিডিয়ার দাপট কাটিয়ে তরুণদের মনে প্রকৃত প্রভাব ফেলতে পারবে?

বাংলার চিরায়ত লোক সংস্কৃতি আজ কেবল শুধু করপোরেট বা এনজিও আগ্রাসনের শিকার নয়, বরং ধর্মীয় মৌলবাদ ও রক্ষণশীলতার এক প্রবল আক্রমণের মুখেও রয়েছে। লোকজ জীবনধারার যে 'উদার' ও 'মরমী' (Mystic) চরিত্র ছিল, তা ধ্বংস করতে এই ধর্মীয় আগ্রাসন কয়েকভাবে কাজ করছে:

১. সমন্বিত সংস্কৃতির মূলে আঘাত
বাংলার লোক সংস্কৃতি (যেমন: বাউল গান, জারি-সারি, যাত্রা পালা গান, পুথি পাঠ, লোকজ কীর্তন, লোকজ মেলা) হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান নির্বিশেষে এক যৌথ জীবনবোধ থেকে তৈরি হয়েছিল।

ধর্মীয় বিভাজন: আধুনিক ওয়াজ মাহফিল বা উগ্র ধর্মীয় প্রচারণার মাধ্যমে লোকজ অনুষ্ঠানগুলোকে 'শিরক' বা 'বিজাতীয়' হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে গ্রামীণ সমাজে যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ছিল, তা নষ্ট হচ্ছে।
উৎসব নিষিদ্ধকরণ: বৈশাখী মেলা, নবান্ন বা গ্রামীণ যাত্রা-পালার মতো অনুষ্ঠানগুলোকে অনেক স্থানে 'ইসলাম বহির্ভূত' বলে বাধা দেওয়া হচ্ছে।

২. বাউল ও সুফি দর্শনের ওপর আক্রমণ
লালন শাহ বা শাহ আবদুল করিমের গান কেবল সংগীত নয়, এটি ছিল মানুষের মুক্তি ও সমতার দর্শন।

তাকফিরি মানসিকতা: বাউলদের 'অমুসলিম' বা 'ভ্রান্ত' আখ্যা দিয়ে তাদের আখড়া ভাঙচুর করা বা তাদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানোর ঘটনা আমরা গত কয়েক দশকে দেখেছি। এটি মূলত লোকসংস্কৃতির সবচেয়ে গভীর ও দার্শনিক অংশটিকে উপড়ে ফেলার চেষ্টা।

চুলের জটা কাটা বা অপমান: বাউলদের মরমী সাধনাকে সামাজিক ও ধর্মীয়ভাবে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার মাধ্যমে যুবসমাজকে তাদের থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

৩. লোকজ শিল্পের বিনাশ
মূর্তি, ভাষ্কর্য ও লোকজ প্রতিকৃতি: মৃৎশিল্পীদের তৈরি শখের হাঁড়ি বা পুতুলকে 'মূর্তি পূজা'র সাথে তুলনা করে সাধারণ মানুষের মনে এক ধরণের ভীতি ও নেতিবাচকতা তৈরি করা হচ্ছে। এর ফলে পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রার মতো লোকজ ঐতিহ্যগুলোকে বির্তকিত করা হচ্ছে।

লোক সংগীতের বিলুপ্তি: গ্রামীণ বিয়ের গীত বা মাটির গানকে 'গুনাহের কাজ' হিসেবে প্রচার করায় গ্রামীণ নারীদের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক চর্চা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

৪. পরিচয় সংকট ও অসহিষ্ণুতা
ধর্মীয় আগ্রাসন তরুণদের মনে এই ধারণা দিচ্ছে যে, 'বাঙালি সংস্কৃতি' এবং 'ধর্মীয় পরিচয়' একে অপরের বিরোধী।

সাংস্কৃতিক শূন্যতা: যখন একজন তরুণ তার শিকড় (লালন, সুলতান বা করিম) থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তখন সেই শূন্যস্থানে উগ্রবাদ সহজেই জায়গা করে নেয়। এটিই মূলত 'যুবসমাজের অবক্ষয়' বা ধ্বংসাত্মক রাজনীতির মূল জ্বালানি নয় কি?

৫. করপোরেট ও ধর্মীয় আগ্রাসনের ‘অদ্ভূত মৈত্রী’
মজার ব্যাপার হলো, একদিকে করপোরেট মিডিয়া সংস্কৃতিকে পণ্য বানাচ্ছে, অন্যদিকে ধর্মীয় রক্ষণশীলতা তাকে সমাজ থেকে মুছে দিতে চাইছে। দুই পক্ষের আঘাতেই সাধারণ মানুষের সহজ ও উদার লোকজ জীবনধারা পিষ্ট হচ্ছে।

মোদ্দাকথা: এস এম সুলতানের আঁকা সেই বলিষ্ঠ কৃষক আজ একদিকে করপোরেট ব্র্যান্ডিংয়ের 'মডেল', অন্যদিকে ধর্মীয় ফতোয়ার ভয়ে নিজ ঐতিহ্য পালন করতে কুন্ঠিত। এই দ্বিমুখী আক্রমণই বাংলার লোকসংস্কৃতির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি বা বিপন্নতার স্বীকার নয় কি?

হাজার বছরের বৈচিত্র্যময় লোকসংস্কৃতি এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতি আজ এক ত্রিমুখী অস্তিত্ব সংকটের মুখে: করপোরেট দখলদারি, রাষ্ট্রীয় অবহেলা এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। আমরা যেভাবে ‘বিপন্ন’ বা ‘কোণঠাসা’ হওয়ার কথা ভাবি, তা কেবল তাদের গান বা নাচ হারিয়ে যাওয়া নয়, বরং একটি জীবনদর্শন ও ভূখণ্ডগত অধিকার কেড়ে নেওয়ার নামান্তর।
এই বিপন্নতার প্রধান কারণগুলো হলো:

পর্যটন ও ‘এক্সোটিক’ পণ্যিকরণ: পাহাড় বা সমতলের আদিবাসী সংস্কৃতিকে এখন করপোরেট পর্যটনের ‘শো-পিস’ বানানো হয়েছে। তাদের পবিত্র ধর্মীয় উৎসব বা ঐতিহ্যবাহী নাচ এখন সাজেক বা বান্দরবানের রিসোর্টগুলোতে পর্যটকদের বিনোদনের সস্তা অনুষঙ্গ। এটি তাদের সংস্কৃতির গাম্ভীর্য ও আধ্যাত্মিকতা নষ্ট করে একে কেবল একটি ‘ফটোজেনিক’ বিষয়ে পরিণত করেছে।

ভূমি থেকে বিচ্ছিন্নতা: আদিবাসী বা লোকজ সংস্কৃতির প্রাণ হলো মাটি ও প্রকৃতি। বন উজাড়, করপোরেট ইকো-পার্ক এবং শিল্পায়নের নামে যখন তাদের ভূমি দখল করা হয়, তখন তাদের সংস্কৃতিও শেকড়চ্যুত হয়। এস এম সুলতান যে কৃষকের শক্তির কথা বলতেন, সেই ভূমিহীন কৃষক বা জুমচাষি আজ নিজ ভূমিতেই পরবাসী। যা আমার স্বচক্ষে দেখা "খাদ্য নিরাপত্তা বনাম খাদ্য বানিজ্য" গবেষণার কাজটি করতে গিয়ে তিন পার্বত্য অঞ্চল রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান আর মধুপূরের আদিবাসী গারো সম্প্রদায়ের বাস্তুচ্যুতির নিদারুণ সংগ্রামের স্বরূপ অন্বেষণে গিয়ে। 

সাংস্কৃতিক আত্মীকরণ (Assimilation): মূলধারার আধিপত্যশীল সংস্কৃতি ও ধর্মের চাপে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা, পোশাক ও খাদ্যাভ্যাস ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। এনজিও-রা ‘উন্নয়ন’-এর নামে তাদের ওপর একধরণের শহুরে ও পশ্চিমা ছাঁচ চাপিয়ে দিচ্ছে, যা তাদের আদি পরিচয়কে মুছে ফেলছে।

ডিজিটাল আগ্রাসন ও পরিচয় সংকট: গ্লোবাল করপোরেট মিডিয়ার প্রভাবে আদিবাসী ও গ্রামীণ যুবসমাজ নিজস্ব ঐতিহ্যের চেয়ে বৈশ্বিক ‘পপ কালচার’-এ বেশি আকৃষ্ট হচ্ছে। ফলে তাদের হাজার বছরের পুরনো কিসসা, লোকগাথা বা ভেষজ জ্ঞান পরবর্তী প্রজন্মে আর সঞ্চারিত হচ্ছে না।
রেফারেন্স হিসেবে যা দেখা যেতে পারে:
এই বিষয়ে মেজবাহ কামাল, ফিলিপ গাইন বা সঞ্জীব দ্রং-এর লেখাগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী। বিশেষ করে ফিলিপ গাইনের 'The Story of Tea Workers' বা আদিবাসীদের ভূমি অধিকার বিষয়ক বইগুলোতে দেখা যায় কীভাবে করপোরেট ও রাজনৈতিক শক্তি একটি জাতির সংস্কৃতিকে সমূলে বিনাশ করে।
এই ধ্বংসযজ্ঞের বিপরীতে আমরা কি মনে করতে পারি, স্বায়ত্তশাসিত সাংস্কৃতিক আন্দোলন কি পাহাড়ি ও সমতলের মানুষের এই বিপন্ন অস্তিত্বকে রক্ষা করতে পারবো?

বাংলার লোকসংস্কৃতিতে করপোরেট আগ্রাসন, এনজিও-র ভূমিকা এবং ধর্মীয় বা রাজনৈতিক প্রভাবের এই জটিল সমীকরণগুলো বুঝতে নিচের বইগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হিসেবে কাজ করতে পারে:

১. অহমদ শরীফ — ‘বিচিত্র চিন্তা’ ও ‘স্বদেশ অন্বেষা’:
বাংলার লোকায়ত দর্শন, বাউল ধর্ম এবং লোকসংস্কৃতির সমাজতাত্ত্বিক ভিত্তি বুঝতে তাঁর বইগুলো অপরিহার্য। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম ও ক্ষমতা লোকসংস্কৃতির উদারতাকে বাধাগ্রস্ত করে।
২. বিনয় ঘোষ — ‘বাংলার লোকসংস্কৃতি’:
লোকসংস্কৃতি যে কোনো স্থির বস্তু নয়, বরং এর পেছনে অর্থনৈতিক ও শ্রেণিগত সংগ্রাম কাজ করে—তা বুঝতে এই বইটি আকর গ্রন্থ। করপোরেট ও বাণিজ্যিক প্রভাবের আদি রূপটি এখানে ধরা পড়বে।
৩. ফরহাদ মজহার — ‘ভাবান্দোলন’ ও ‘লালন লোকায়ত ধর্ম ও রাজনীতি’:
এনজিও-র হস্তক্ষেপ এবং লোকসংস্কৃতিকে ‘এনজিওকরণ’ করার বিরুদ্ধে তাঁর দীর্ঘদিনের শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান রয়েছে। লালন ও শাহ আবদুল করিমের দর্শনকে কীভাবে আধুনিক করপোরেট ও এনজিও কাঠামো বিকৃত করছে, তা নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণ অত্যন্ত তীক্ষ্ণ।
৪. বদরুদ্দীন উমর — ‘সংস্কৃতির সংকট’:
সংস্কৃতি কীভাবে শাসক শ্রেণি বা পুঁজিবাদী শক্তির হাতিয়ারে পরিণত হয় এবং এর ফলে যুবসমাজের যে নৈতিক ও রাজনৈতিক অবক্ষয় ঘটে, তার একটি ধ্রুপদী বিশ্লেষণ এই বইতে পাওয়া যাবে।
৫. শিমুল সালাহ্উদ্দিন — ‘বাংলা ও বাউল’:
বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে বাউল ও লোকজ ঘরানার ওপর করপোরেট আগ্রাসন এবং হেরিটেজ ব্র্যান্ডিংয়ের প্রভাব বুঝতে এই সমসাময়িক কাজগুলো দেখা যেতে পারে।
৬. সাইমন জাকারিয়া — ‘বাংলাদেশের লোকসংগীত’ ও ‘পণ্ডিতের ভিটায় লালন সাঁই’:
মাঠ পর্যায়ের গবেষণার মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে লোকজ মেলা বা উৎসবগুলো বাণিজ্যিকীকরণের ফলে তাদের আদি রূপ ও সামাজিক আবেদন হারিয়ে ফেলছে।
৭. এস এম সুলতানের সাক্ষাৎকার ও জীবনী (যেমন: হাসনাত আবদুল হাইয়ের ‘সুলতান’):
যদিও এটি জীবনীগ্রন্থ, কিন্তু সুলতানের শিল্পদর্শন কীভাবে করপোরেট ও পশ্চিমা আর্ট গ্যালারির বিপরীতে দাঁড়িয়ে বাংলার মাটিকে ধারণ করেছিল, তা এখান থেকে স্পষ্ট হয়।
৮। অধ্যাপক মোহাম্মদ আযম ; বর্তমান বাংলাদেশের বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অত্যন্ত প্রভাবশালী একজন চিন্তক এবং প্রাবন্ধিক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের এই অধ্যাপক গতানুগতিক 'একাডেমিক' আলোচনার বাইরে গিয়ে যেভাবে সাংস্কৃতিক রাজনীতি, জাতীয়তাবাদ এবং লোকসংস্কৃতির রূপান্তর নিয়ে বিশ্লেষণ করছেন, তা আলোচিত 'করপোরেট আগ্রাসন' ও 'মিউজিয়ামাইজেশন' বিতর্কে এক নতুন মাত্রা যোগ করে।

এই বইগুলো পড়লে আমরা আরো চিন্তার স্বপক্ষে শক্তিশালী তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক যুক্তি খুঁজে পাবো।

পরিশেষে বাংলার লোকসংস্কৃতিকে তার জীবন্ত সামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে 'গ্যালারি পণ্য' বা 'শৌখিন হেরিটেজ'-এ রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় আরও কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম আলোচিত হয়। এরা মূলত লোকজ জীবনকে 'ফ্রেমে বন্দি' করে অভিজাত শ্রেণির ড্রয়িংরুমের বিষয় বানিয়ে ফেলেছে:

প্রভাবশালী ব্যক্তি ও কিউরেটর (Curators)
লুবনা মারিয়াম: যদিও তিনি শাস্ত্রীয় ও লোকজ নাচের প্রসারে কাজ করেন, তবে 'সাধনা'র মতো সংগঠনের মাধ্যমে লোকজ নাচকে শহুরে মঞ্চ ও গ্যালারি ফরম্যাটে উপস্থাপনের ফলে এর আদিম ও বুনো (Raw) চরিত্রটি অনেক সময় মার্জিত বা 'পলিশড' হয়ে যায়।
কানজুল হুদা: বিভিন্ন হেরিটেজ ফেস্টিভ্যাল ও কারুশিল্প প্রদর্শনী কিউরেট করার ক্ষেত্রে তাঁর নাম যুক্ত। এসব আয়োজন লোকজ কারিগরদের সরাসরি যুক্ত করার চেয়ে শহুরে ক্রেতাদের কাছে একে 'এলিট পণ্য' হিসেবে তুলে ধরে।
সাঈদ আহমেদ: শিল্প সংগ্রাহক ও কিউরেটর। লোকজ শিল্পকে যখন ব্যক্তিগত সংগ্রহ বা গ্যালারির দেয়ালে সাজানো হয়, তখন তা সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যায়।

প্রতিষ্ঠান (Heritage & Museum-making)
ইউনেস্কো (UNESCO): 'ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ' ঘোষণার মাধ্যমে তারা কোনো সংস্কৃতিকে বিশ্বস্বীকৃতি দেয় ঠিকই, কিন্তু এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে সেই সংস্কৃতির স্বাভাবিক বিবর্তন থমকে গিয়ে তা একটি 'সংরক্ষিত জাদুঘর সামগ্রী'তে পরিণত হয়। যেমন—শীতল পাটি বা রিকশা পেইন্টিং।
বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন (সোনারগাঁ জাদুঘর): এটি সরকারি প্রতিষ্ঠান হলেও, এখানে লোকজ মেলা বা প্রদর্শনীগুলো এখন অনেক বেশি বাণিজ্যিক ও পর্যটন-নির্ভর। শিল্পীরা এখানে কেবল 'জীবন্ত প্রদর্শনী' (Living Exhibits), তাদের জীবনমানের মৌলিক কোনো পরিবর্তন বা রাজনৈতিক সংগ্রাম এখানে অনুপস্থিত।
যাত্রা (Jatra - Lifestyle Brand): এই ব্র্যান্ডটি লোকজ মোটিফ ও শিল্পকে অত্যন্ত চড়া দামে শহুরে উচ্চবিত্তের লাইফস্টাইল পণ্যে পরিণত করেছে। এখানে লোকসংস্কৃতি কেবল একটি 'এস্থেটিক ডিজাইন', এর পেছনে থাকা গণমানুষের দর্শন বা দ্রোহ নয়।
বেঙ্গল গ্যালারি অব ফাইন আর্টস: এস এম সুলতানের মতো শিল্পীদের কাজকে তারা আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছে দিলেও, তা মূলত উচ্চবিত্ত ও বিদেশিদের কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। এতে শিল্পীর সেই 'মাটির টান' গ্যালারির কৃত্রিম আলোয় ঢাকা পড়ে যায়।

এনজিও ও দাতাগোষ্ঠী (Donor Agencies)
ইউএসএআইডি (USAID) ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন: বিভিন্ন 'কালচারাল প্রিজারভেশন' প্রজেক্টের মাধ্যমে তারা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা লোকজ শিল্পীদের অর্থায়ন করে। কিন্তু এই অর্থায়নের শর্ত হিসেবে শিল্পীদের তাদের নিজস্ব স্বকীয়তা বিসর্জন দিয়ে দাতাদের পছন্দমতো 'প্যাকেজ' তৈরি করতে হয়।

এই ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো লোকসংস্কৃতিকে 'এক্সোটিক' (Exotic) বা চমৎকার এক বিদেশি বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করে। এতে করে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি আমাদের কাছেই অচেনা ও 'আভিজাত্যের প্রতীক' হয়ে দাঁড়ায়, যা সুলতান বা শাহ আবদুল করিমের মতো মহাজনদের দর্শনের সম্পূর্ণ বিপরীত দর্শন নয় কি?
আমরা কি মনে করতে পারি, চিরায়ত লোক সংস্কৃতির বিপন্নতায় এই গ্যালারি কালচার থেকে মুক্তি পেতে লোকসংস্কৃতিকে পুনরায় রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের অংশ করা প্রয়োজন?

সৌরভ বড়ুয়া

সাংস্কৃতিক অনুরাগী, লেখক ও সামাজিক গবেষক। বাংলাদেশ।

শেয়ার করুন:
মন্তব্যসমূহ (0)

এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। যেসব ঘর পূরণ করা বাধ্যতামূলক, সেগুলোতে * চিহ্ন দেওয়া আছে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন