এক অপ্রতিম এবং একটি আই ফোন
একটি আই ফোন এবং আমাদের বিবেককে আবারও নাড়া দিয়ে এক অপ্রতিম এর অকাল প্রয়াণ! একটি মৃত্যু এবং অনেক প্রশ্ন!
গত ক'দিন ধরে মিডিয়ার পর্দায় সপ্তম শ্রেণীর এই কিশোরের মৃত্যুকে নিয়ে অসংখ্য পোস্ট চোখে পড়েছে! বিভিন্ন জন বিভিন্ন মতামত রেখেছেন। এবং তার মধ্যে অনেকেরই গতানুগতিক সেই দাবী 'অপরাধীর ফাঁসি চাই'! এই অপরাধের বিচার কী হবে বা হওয়া উচিত সে দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। এ নিবন্ধের মূল উদ্দেশ্যও তা নয়।
এই ধরনের ঘটনা/দুর্ঘটনাগুলো আসে আর যায়। আমাদের বিবেক কিছুক্ষণ বা কিছুদিনের জন্যে একটু তাড়িত হয় এবং তারপর যথারীতি বেমালুম ভুলে যাওয়া! আমরা ঘটনাকে দেখি কিন্তু ঘটনার পিছনের ঘটনা বা কারণগুলোকে কখনো গভীরে খতিয়ে দেখি না এবং চেষ্টাও করি না। একটি পোস্টে দেখলাম অপ্রতিম এর মায়ের হৃদয়বিদারক আহাজারি । তিনি বলছেন- 'আমি বিচার চাই না। আমি চাই এই দেশটি তলিয়ে যাক, ধ্বংস হোক'! আজকের বাংলাদেশে যারা বিবেকবান আছেন তারাও হয়তো বলছেন 'এ কোন দেশে বাস করছি!? আমিও হয়তো তাদের সাথে সহমত পোষণ করে আরও একধাপ এগিয়ে বলবো- এ শুধু কোনো দেশ নয়, বলতে ইচ্ছে হয় এ কোন বিশ্বে বাস করছি!?
এমন ভাবে শূন্য হয়ে যাওয়া একজন মা, একজন বাবার বুকের ভার দূর করার সাধ্য পৃথিবীর কোনো কিছুরই নেই। তবে কেন লিখছি? একটি আই ফোন প্রো ম্যাক্স এবং একটি জীবন! অনেকদিন পূর্বে একটি প্রতিবেদনে পড়েছিলাম, চায়নায় এমন একটি ফোনের জন্যে কোনো কোনো কিশোর/তরুণেরা তাদের একটি কিডনি বিক্রি করে দেয়! দু'টা ভিন্ন বিষয় কিন্তু সূত্র এক। রোগের মূল কারণও এক। শোবিজ বাজারি পৃথিবীতে পুঁজিবাদী ভোগবিলাসী ধারণার মনস্তাত্ত্বিক এবং সমাজতাত্ত্বিক ধোলাই। সুপরিকল্পিত ভাবে এই ব্যবস্থাটি চলছে শতবছরেরও বেশি সময় ধরে। এবং বর্তমানে তা সফলতার তুঙ্গে। যার ফলশ্রুতি এতটা অকালেই মায়াবী দর্শনের এই ছেলেটির জীবন নাশ! আমি জানি এর জন্যে অনেকেই অনেককিছু দোষবেন, অনেক কারণ খুঁজবেন। কিন্তু এই সমস্যা শুধু আজ অপ্রতিম বা এমন দু'একটা পরিবারের সমস্যা নয়। এটি এখন একটি বৈশ্বিক সমস্যা। এবং বাংলাদেশে তা ভয়াবহ রূপে প্রকট! কেন? কারণ পুঁজিবাদী আই ওয়াশ ধোলাইয়ের কারণে বহুদিন হ'লো আমরা হিসেব কষতে ভুলে গেছি যে, আত্মমর্যাদা ধরে রেখে একটি শান্তিপূর্ণ জীবনের জন্যে আমাদের কী কী প্রয়োজন, কতটুকু প্রয়োজন। কিন্তু সেই প্রয়োজনটুকু পূর্ণ হওয়ার পরেও আমাদের মস্তিষ্কে চাওয়ার নেশার দৌড় কখনো থামে না। কী কী নাইয়ের হাহাকার থামে না! একটি জীবন, একটি নিজস্ব কিডনি তাই আজ একটি আই ফোনের কাছে মূল্য হারিয়ে ফেলে অবলীলায়! বস্তুবাদী প্রচার এবং মগজ ধোলাই পদ্ধতির এটাই সফলতার মাপকাঠি। ধন্য ধন্য পুঁজিবাদ, ধন্য ধন্য ভোগবাদ! ধন্য ধন্য শোবিজ জগৎ!
বলছিলাম বাংলাদেশে এই সমস্যা ভয়াবহ রূপে প্রকট। আর্থিক দারিদ্র্য এবং দৈন্যতা এর জন্যে অবশ্যই দায়ী তবে তার চেয়েও অনেক গুন বেশি দায়ী এই জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগ লোকের মানসিক দারিদ্র্যতা! প্রকৃত অর্থে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পর্যায় থেকে শুরু করে জাতিটার অধিকাংশ মানুষেরই এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনো মূল্যবোধ তৈরী হয়নি। এদিকটায় তারা ভীষণ রকম দেউলিয়া! এরা এখনো জানে না এদের সঠিক আত্মপরিচয়ের ঠিকানা! আর সেকারণেই সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোর প্রতিটি ক্ষেত্রে অনিয়ম এবং দুর্নীতিই আজকে একটি প্রতিষ্ঠিত সাংস্কৃতির রূপ নিয়েছে! কদাচিত কেউ কখনো দু’একটা ভালো কাজ করে ফেললে, সততার পরিচয় দিলে তা একটি বিশেষত্ব নিয়ে গণমাধ্যমে প্রচারের বিষয় হয়ে উঠে! তাদের মস্তিষ্কেই নেই যে এটা তো কোনো বিশেষত্ব নয়। এটাই তো হওয়া উচিত ছিল স্বাভাবিক। মনুষ্যত্ব, আত্মপরিচয় এবং মানবিকতাবোধের এই দেউলিয়া পনার জন্যেই আমরা দেখতে পাই জনগোষ্ঠীর একটি তাৎপর্য পূর্ণ অংশ পশ্চিমা ট্র্যাশ সংস্কৃতি এবং উচ্ছৃঙ্খল জীবন যাপনকে দ্রুত আত্মস্থ করে নিজেকে উন্নত জাত ভাবছে! অন্যদিকে বিশাল আরেকটি শ্রেণী মন ও মানসে ইসলাম বা ধর্মের ছিঁটেফোঁটাও ধারণ করে না অথচ লেবাসে হয়ে উঠছে ভয়ঙ্কর এক টুপিধারী বা হিজাবি! শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত বিরাজ করছে অরাজকতা। বিশেষ করে মাদ্রাসাগুলোতে ধর্ষণের হিড়িক! গড়ে উঠছে ধর্ষণ সিন্ডিকেট! এই-ই যখন একটি জাতির সার্বিক পরিচয়, তাদেরকে অধঃপতিত করার জন্যে তো বৈদেশিক কোনো শক্তির তেমন কোন কসরতই করতে হয় না। কারণ এরা নিজেরাই তো নিজেদেরকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে সেই গর্তে।
আধুনিক প্রযুক্তি একটি বিশাল বানিজ্য। কিন্তু বাংলাদেশের আর্থসামাজিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এই প্রযুক্তির কোন অংশগুলো কোন ভোক্তাদের জন্যে কতটা প্রয়োজন তা নির্ধারণ করার দায়িত্ব সরকার যেমন নেয় না তেমনি আমজনতারা নিজেরাও এগুলোর কোনটি কতটুকু তার প্রয়োজন তা জানে না। শুধু চাই আর চাই। কোনটা চাই, কতটুকু চাই, কী জন্যে চাই এর কোনোকিছুই তাদের মস্তিষ্কে নেই! এদের মস্তিষ্কে নেই কী করবে আর করবে না। তাই কেউ ভাত খাইয়ে পরে মেরে ফেলে আবার কেউ এক প্লেট ভাত খাওয়ার জন্যে মেরে ফেলে। শুধুমাত্র চোর সন্দেহে পৈশাচিক উল্লাসে গণধোলাই নিয়ে নেয় একটি প্রাণ! এরা জানে না কার ক্ষোভ, কোন রাগ কোথায় ঝারছে কার উপর ঝারছে? যারা এটা করে তারাই বা কতটা ধোয়া তুলশী পাতা? এদের কাছে একটি জীবনের মানে এখন লুডুর বোর্ডে ছক্কা-পাঞ্জার সমান! জানি বঙ্গীয় পাঠকেরা ইদানীং দু'মিনিটে পৃথিবী বুঝে ফেলেন। দীর্ঘ লেখা পড়ার ইচ্ছে বা সময় কোনোটাই তাদের নেই! তারা জীবনকে বুঝতে এবং উপভোগ করতে চায় পরিশ্রম ছাড়াই! তবুও পরবর্তী অংশে বৈশ্বিক বিষয়ের চিত্রটা একটু তুলে ধরার চেষ্টা করলাম!
বেশি দূর অতীতে যেতে হবে না। গত কয়েকশতক থেকে বর্তমান বিশ্ব কাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত? এদের চরিত্রের নেতিবাচক দিকগুলো ব্যাখ্যা করতে গেলে পাতার পর পাতা শেষ হয়ে যাবে তবু তা সমাপ্তি রেখায় পৌঁছাবে না। শুধু চোখ এবং বিবেক খুলে দেয়ার জন্যে শুধুমাত্র কয়েকটি বড় ঘটনা প্রশ্ন আকারে তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
১. দাস ব্যবসা কারা করেছে? ২. ঔপনিবেশিক দস্যুতাবৃত্তি কারা করেছে এবং করছে? ৩. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঘটানোর জন্যে পর্দার অন্তরালে মঞ্চের সাজসজ্জা কারা সাজিয়েছে? অথচ বলির পাঠা হিসেবে সবাই আমরা এখনো শুধুমাত্র হিটলার এবং তার নাৎসীবাদকে দোষারোপ করে যাচ্ছি! ৪. ১৯৪৮ সাল থেকে ইসরায়েলের মাধ্যমে ফিলিস্তিনীদের উপর যে হত্যা, দমন নিপীড়ন, উচ্ছেদ এবং দখল অভিযান চলছে, তার অর্থ, অস্ত্র, পরিকল্পনা, প্রচার-প্রপাগান্ড সহ এই ঘৃণ্য অপরাধের পিছনে কাদের অকুণ্ঠ সমর্থন? শুধু এগুলোই নয়, ১৯৯৪ সালের রুয়ান্ডার গণহত্যা, আজকের সুদান, কঙ্গো, সাউথ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গদের শাসন/শোষণ, বর্তমানের ভেনেজুয়েলা, এমন কী টুইনটাওয়ার ধ্বংসের সন্ত্রাসী কর্ম, এই তালিকার কোনো শেষ নেই। সর্বপরি পৃথিবীর ইতিহাস ঘাটলে আঞ্চলিক বিরোধ থেকে শুরু করে এমন কোনো যুদ্ধ, হত্যা, গণহত্যা খুঁজে পাওয়া যাবে না যার পিছনে প্রত্যক্ষ্য বা পরোক্ষভাবে ব্রিটিশদের হাত নেই। বর্তমানে সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার গংয়েরা। অথচ এরাই হ'লো আমাদের কাছে সভ্য এবং উন্নত জাত। এরাই হ'লো পৃথিবীর নিয়ন্ত্রক! এবং আমরা তা বিনা প্রশ্নে মেনে নিয়েছি! কারণ? মিডিয়া সাম্রাজ্যবাদ। বড় বড় সব মিডিয়ার মাধ্যমে সুপরিকল্পিত ভাবে সত্যকে চাপা দিয়ে খাওয়ানোর মতো করে মিথ্যেকে সাজিয়ে তারা বাজারে ছাড়ে এবং বিশ্বের আমজনতা তা বেদবাক্যের মতো গিলে খায়! বর্তমান পারস্য যুদ্ধের কারণ হিসেবে পশ্চিমা বিশ্বের অর্ধেকের বেশি আমজনতা হয়তো এখনো ইরানকেই দায়ী মনে করে। কারণ এরা তো ঘটনার পিছনের কারণ কখনো অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে দেখে না। বিবিসি, সিএনএন, ফক্স নিউজ সহ পশ্চিমা কর্পোরেট মিডিয়া আউটলেট থেকে প্রচারিত মিথ্যের যে প্রচার সেটুকুই তারা বিশ্বাস করে। সেখানে ধন্যবাদ জানাই ইউটিউব, ফেসবুকের মতো মিডিয়ায় বর্তমানের কিছু পডকাস্টারদের। সেন্সরশীপের আওতায় থেকেও তারা কিছু সত্যকে তুলে ধরার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। জাস্ট বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি মিস্টার ডনাল্ড ট্রাম্পের চারিত্রিক ইমেজটাকে একটু কল্পনা করার চেষ্টা করুন। এবং তারপরে ভাবতে চেষ্টা করুন এই পাপেটকে যারা ক্ষমতার মঞ্চে তুলে দিয়ে তাদের স্বার্থকে হাসিল করে যাচ্ছে তাদের চরিত্র এবং তাদের মানবতার মডেল। এবং এরাই হ'লো পৃথিবীর যাবতীয় অর্থ সম্পদ এবং ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক। ইসরাইলী বোমার আঘাতে দুই হাত দুই পা হারানো একটি ফিলিস্তিন শিশু এদের কাছে তাদেরই ছকে বাঁধা সভ্যতার একটি উপোভোগ্য উপাদান এবং সফলতা! এরা ন্যাটো তৈরী করে জোট বেঁধে এই অপকর্মকে চালিয়ে যাবার জন্যে। আর জাতিসংঘ তৈরী করে তাকে বৈধতা দেয়ার জন্যে! তাই-ই বলতে হয় আমরা কোন সভ্যতার পৃথিবীতে বাস করছি!?
এক সেলফোনের জন্যে এক তুহিন খুনী হয়, এটা দেখে তাই আর বিস্মিত হই না। '৭১ পর থেকে বহু দফায় সংবিধানে পরিবর্তন এসেছে কিন্তু বাংলাদেশী বাঙালীদের চরিত্রের কোনো সংশোধন হয়নি। বরং সময়ের সাথে সাথে তা আরও অধঃপাতে গেছে! যে দেশে জুম্মাবারে নামাজীদের কাতার গিয়ে রাস্তায় ঠেকে, সেই দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে কেন এতটা দুর্নীতি, খুন রাহাজানি, ধর্ষণ? প্রশ্নটা সবাই একবার নিজের কাছে নিজে করুন। সৎ উত্তর খুঁজুন। দেখবেন নিজের কাছেই নিজের ভন্ডামিটা বেড়িয়ে পড়বে। এবং যদি সত্যিকারেই একটি সুস্থ সমাজ ব্যবস্থা চান তাহলে সেখান থেকে নিজেকে শুধরে পথ হাঁটা শুরু করুন। এর ওর উপরে দোষ চাপিয়ে লাভ নেই। সবাই যে যার মতো শুদ্ধ হ'লে দেশ ও জাতি শুদ্ধ হবে। আইন শুধু সেখানে একটি সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
লেখক পরিচিতি
ফরিদ তালুকদার
টরোন্টো নিবাসী বাঙালি কবি, গল্পকার ও প্রাবন্ধিক। তাঁর লেখা প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অন্ধ’।
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!